‘আদতে বাংলাদেশ দুর্ভাগা। এ দেশে মহান স্বাধীনতার স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে বিনা দোষে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল ঘাতকের দল। দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে এমনিভাবে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার ঘটনা বিরল। ঐ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই সার্বভৌম দেশ যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও অনুরূপ একটি ঘটনার সূচনা হয়েছিল গোপলগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার জনসভাস্থলে শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে রাখার মধ্য দিয়ে।’ এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামিরা (হুজি জঙ্গি) দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলতে নারাজ। তারা জঙ্গি তত্পরতার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। কিন্তু জঙ্গিদের এ ধরনের চিন্তা দেশের প্রচলিত আইন কখনো সমর্থন করে না। কারণ এরা সবাই জন্মগতভাবে এ দেশেরই নাগরিক। ষড়যন্ত্র করে শক্তিশালী দুটি বোমা পুঁতে রাখার মধ্য দিয়ে যে অপরাধ আসামিরা সংঘটিত করেছে, তা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও জঘন্য। এমতাবস্থায় দীর্ঘ হাজতবাস বিবেচনায় তাদের দণ্ড হ্রাসের সুযোগ নেই।
বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল খারিজ করে গতকাল বুধবার এ রায় দেন। ভাষার মাস হওয়ায় এই মামলার রায় বাংলায় দিয়েছে আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ষড়যন্ত্রকারী আসামিরা মূলত যাকে হত্যা করার জন্য এই বোমা পুঁতে রাখার ঘটনার অবতারণা করেছিল, তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) দেশের বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে তখন ক্ষমতায় ছিলেন। একটি বৈধ সরকারপ্রধানকে তার সহযোগীদেরসহ হত্যার প্রচেষ্টা এবং তা বাস্তবায়ন করা কতখানি দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর, তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তীকালে এদেশের নিরীহ স্বাধীনতাকামী জনগণ উপলব্ধি করে। আসামিদের ভ্রান্ত চিন্তা ও ধারণা এই জাতির জন্য একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। দেশের মানুষের কল্যাণের স্বার্থে জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি তত্পরতা চিরতরে এদেশ থেকে বিলীন হওয়া প্রয়োজন।
২০০০ সালের ২০ ও ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুত্ফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের পাশ থেকে ৭৬ কেজি এবং হেলিপ্যাড থেকে ৪০ কেজি ওজনের দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৭ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ বিশেষ ক্ষমতা আইনে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ফাঁসির দণ্ড বহালের রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ‘সাক্ষীদের সাক্ষ্য, জব্দকৃত আলামতসমূহের প্রমাণাদি এবং আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, উচ্চ আদালতের কর্তৃত্বসমূহ এবং সার্বিক পর্যালোচনা করে আমরা (বিচারপতিদ্বয়) মনে করি, ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিশেষ ক্ষমতা আইনে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কোনো আইনগত ভুল করেননি।’ এছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদের সাজা বহাল রয়েছে। তবে ১৪ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সারোয়ার হোসেনকে খালাস দিয়েছে হাইকোর্ট। আসামি মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজ ২০০৬ সাল থেকে কারাগারে আটক রয়েছেন। জেল কোড অনুযায়ী ১৪ বছরের দণ্ড ভোগ শেষ হয়ে থাকলে তাকে মুক্তি দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
কেন এই হত্যাচেষ্টা
সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেছে, হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ অন্য আসামিরা ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মুগদার অফিসে মিটিং করে। ঐ মিটিংয়ে জঙ্গিরা মতামত প্রকাশ করে যে, ‘আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামবিদ্বেষী এবং একটি দেশের দালাল হিসেবে ইসলাম ধংসের কাজে লিপ্ত।’ সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে উত্খাত করতে হবে।