ভোক্তাকে সচেতন হইতে হইবে সর্বাগ্রে

কিছুদিন পূর্বে বিশ্বখ্যাত চিকিত্সা সাময়িকী ল্যানসেট জানাইয়াছে, বাংলাদেশের ২০ শতাংশ মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী কুখাদ্য গ্রহণ। কুখাদ্য কী—তাহা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি খাদ্যে ভেজাল বন্ধে কঠোর হইবার নির্দেশ দিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার গণভবন হইতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২১-এর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘দুই পয়সা বেশি কামানোর জন্য ভেজাল দিতেই থাকে। পচা-গন্ধ খাবার দিতে থাকে। খাবারের মানটা ঠিক রাখার জন্য দামটা হয়তো একটু বেশি পড়তে পারে, কিন্তু ভেজাল যাতে দিতে না পারে, সেটা নজরদারি করতে হবে। কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ভেজাল খাদ্য কতখানি বিপজ্জনক—তাহা লইয়া ইতিপূর্বে আমরা অনেকবার লিখিয়াছি। সমস্যা কোথায়? অর্থনীতির ভাষায় বলিতে হয়—খাদ্যের বাজারে ‘চাহিদা’ ও ‘জোগান’ হাত ধরাধরি করিয়া হাঁটে। অর্থাত্ ‘চাহিদা’ না থাকিলে ‘জোগান’ কমিয়া যায়। চারিদিকে যখন ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারে সয়লাব, তখন অনেকেই বলিয়া থাকেন, এই ভেজাল কমিবে না সহজে। কারণ, ভোক্তা সচেতন নহে, ইহাই ক্রয় করিতেছে। এখন ভোক্তা যদি ভেজালের ব্যাপারে সচেতন হইয়া অনিরাপদ খাদ্যপণ্য ক্রয় করা বন্ধ করিত, তাহা হইলে বিক্রেতার কানেও পানি ঢুকিত। তাহাদের ভেজাল পণ্য বিক্রয় হইত না, তাহাদের আর্থিক লস হইত এবং বুঝিত যে মানুষ ভেজালের ব্যাপারে সচেতন। ভোক্তার এই সচেতনতার প্রয়োজন তাহার সুস্বাস্থ্যের স্বার্থেই। মনে রাখিতে হইবে, খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, তবে তাহা আর ‘খাদ্য’ থাকে না। সেই কুখাদ্য আর স্লো পয়জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। একটি সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বত্সর দেশে ৩ লক্ষাধিক মানুষ ক্যানসারে, ২ লক্ষাধিক মানুষ কিডনি রোগে, দেড় লক্ষাধিক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হইয়া থাকে। ইহা ছাড়া গর্ভবতী মায়েরা প্রায় ১৫ লক্ষ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মদান করেন। দেখা যাইতেছে, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও দিনদিন বাড়িয়াই চলিতেছে।

ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে দেশে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত আছে। কিন্তু তাহাতে খুব বেশি মামলা নাই। ইহার কারণ হিসাবে জানা গিয়াছে, খাদ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত ভোক্তা সরাসরি মামলা করিতে পারে না। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভেজাল রোধে চুপচাপ বসিয়া নাই। গত কয়েক বত্সরে বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), এলিট ফোর্স র্যাব এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কয়েক হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিয়াছে। এই সকল অভিযানে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় প্রায় ২৫ হাজার মামলা হইয়াছে এবং প্রায় শতকোটি টাকা জরিমানাও আদায় করা হইয়াছে।

কিন্তু তাহাতেও কি টনক নড়িয়াছে ভেজাল আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের কারবারিদের? দুশ্চিন্তার আরো জায়গা রহিয়াছে। একটি পণ্য খাবারের অনুপযুক্ত কি না, তাহা অনুধাবনের অন্যতম উপায় হইল উহার মেয়াদকাল দেখিয়া লওয়া। সেই  ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কোনো ভোক্তা সহজেই এড়াইয়া যাইতে পারে। কিন্তু কিছু অসত্ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক আরো ভয়াবহ একটি অপরাধ করিয়া থাকে। তাহারা মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্যের তারিখ মুছিয়া হালনাগাদ তারিখের সিল-ছাপ্পর বসাইয়া দেন। অর্থাত্ খাদ্যপণ্যটি মেয়াদোত্তীর্ণ হইলেও ভোক্তার তাহা বুঝিবার উপায় নাই। তাহা হইলে উপায় কী? কেবল বাংলাদেশ নহে, অনিরাপদ খাদ্য এখন সমগ্র বিশ্বেই জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হইতেছে। স্পষ্টতই, কেবল আইন ও কর্তৃপক্ষই শেষ কথা নহে, প্রতিটি ভোক্তাকে সচেতন হইতে হইবে নিরাপদ খাদ্য ক্রয় ও গ্রহণের ব্যাপারে। সকলের সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমেই খাদ্যের নিরাপদ ব্যূহ তৈরি করিতে।