১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার অনেক সাধ্যসাধনা করে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল, যাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বৈদেশিক অনুদান, খাদ্যসহায়তা ও সহজ শর্তে লোন পাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা পায়। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনের দিকে অতিদ্রুত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। এক দশক পর এই মর্যাদা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি নানা প্রতিকূলতার কারণে। বাংলাদেশ আজও স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। তবে স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে আসছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এখন মোট ৩৮টি দেশ (ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ২৮টিসহ) থেকে ট্যারিফ-সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক বেশির ভাগ বাণিজ্য সুবিধাগুলো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটার সত্যিকার সুফল বাংলাদেশ পেয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। এটা অনেক বড় সম্মান। এ সম্মান বাংলাদেশ এক দিনে অর্জন করেনি। তবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত বাণিজ্য সুবিধাগুলো থাকবে না। সেটা তো এক অর্থে ভালো কথাই। কিন্তু নেতিবাচক বিষয়ও আছে। বড় কথা হলো বাংলাদেশকে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। উল্লেখ্য, জিএসপি না পেলে পোশাক রপ্তানিকারকরা প্রায় চার বিলিয়ন ডলার থেকে বঞ্চিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ২০০৯-১০ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি করা হয়েছিল ১২.৪৯ বিলিয়ন ডলারের। সেটা বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়ায় ২৭.৯৫ বিলিয়ন ডলার।
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর বাংলাদেশ জিএসপি ছাড়াও অনেক বাণিজ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফ্রি/প্রিফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে হবে, যাতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন না হতে হয়। এ ধরনের বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি না করতে পারলে রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে।
এমনকি ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি একসময় বলেছিলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে পণ্য রপ্তারি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৬.৭ ভাগ ট্যারিফ বহন করতে হবে, যা বাত্সরিক ২.৭ বিলিয়ন ডলার লোকসান হিসেবে গুনতে হবে। ইউএনসিটিএডি (UNCTAD) বলেছে এলডিসি উত্তরণের ফলে ৫.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশ রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটা মোটেই ভালো সংবাদ নয়। এসব কথা বিবেচনা করে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এগুলোকে সমাধান করতে হবে ।
সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশ-ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রিফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (PTA) হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দুই স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ১৫ ভাগ বাণিজ্য বেড়ে যাবে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভুটানকে বাংলাদেশের নৌবন্দর, সৈয়দ বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য আশ্বস্ত করেছেন। এত করে আঞ্চলিক বাণিজ্য কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কয়েক মাস আগে থেকে প্রতিবেশী ভারত ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করা শুরু করেছে। যার ফলে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় বাড়ছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। এছাড়াও কিছু দিন আগে নেপালকে রেল ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এসব চুক্তি অত্যন্ত ইতিবাচক।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আরো ৪৪টি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার জন্য চিন্তাভাবনা চলছে। অচিরেই, ১১টি দেশের সঙ্গে এ চুক্তি করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশা করা যায় এ চুক্তিগুলো ২০২১ সালের মধ্যে সম্পাদন হবে। আবার আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের মোট পণ্যের ৯৭ ভাগ শুল্ক সুবিধা পেলেও সেখানে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে এ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না, যা আমেরিকার বাজারে প্রধান রপ্তানি পণ্য। আমেরিকায় পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ১৫.৬২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয় যা বাংলাদেশের জন্য বোঝার মতো। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে সেসব দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সেটা আগে থেকে ভেবে দেখতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আহ্বান করেছে। কারণ আমদানি শুল্ক কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। চীন থেকে প্রতি বছর যে পণ্য আমদানি করা হয় তা থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকার আমদানি শুল্ক হিসেবে রাজস্ব আদায় হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও আমদানির পরিমাণ বেশি।
দুঃখের বিষয় হলো সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মুক্তবাণিজ্য নিয়ে কথাবার্তা ১৯৯৯ সালে শুরু হলেও তা ২০০৫ সালে শেষ হয়ে যায়। এরপর এ বিষয় নিয়ে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবে বিমসটেক নামে আরেকটি আঞ্চলিক জোট ২০০৪ সালে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এ আলোচনা থেমে নেই। বাংলাদেশসহ বিমসটেকভুক্ত সাতটি দেশ যদি নিজেদের মধ্যে ফ্রি বা প্রিফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পাদন করতে পারে তাহলে অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ড হলো বিমসটেকভুক্ত দেশ।
অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ যে, বাংলাদেশ এখন মেজর ট্রেড ব্লক—আসিয়ানের সঙ্গে এফটিএ করার জন্য আলোচনা শুরু করেছে। ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশ, আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামে সদস্য হিসেবে আছে। এজন্য আসিয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যবিষয়ক চুক্তির আলোচনা ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আসিয়ান অঞ্চল বিশ্বের মধ্যে বৃহত্ অর্থনীতির দিক থেকে চতুর্থ স্থানে থাকবে। এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যুগোপযোগী। এছাড়াও, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন এবং কানাডার সঙ্গে প্রিফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এ বছরের নভেম্বরের ১৫ তারিখে ‘রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ (আরসিইপি) নামে বিশ্বের সর্ববৃহত্ মুক্তবাণিজ্য এলাকা গঠিত হলো। আসিয়ানভুক্ত দেশের সঙ্গে কিছু দেশ মিলে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আফসোসের বিষয় যে, এখানে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অথচ বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ-ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস এ চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করেছে। আরসিইপিয়ের সম্মিলিত জিডিপি ২৬.২ ট্রিলিয়ন ডলার যেখানে মোট লোকসংখ্যা ২.২ বিলিয়ন। এখন যদি বাংলাদেশ আরসিইপিতে যোগদান করতে পারত, এলডিসি উত্তরণের সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধার সন্মুখীন হতে হতো না। জাতিসংঘের ইউএনসিটিএডিয়ের মতে, আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোতে ৭০ ভাগ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহিত হয়, যা আসে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে। এজন্য এ জোটে যোগদানের জন্য বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধি করতে হবে। চীন থেকে যে বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসত সেটা চলে যাবে এখন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং লাউসে। এছাড়াও, কোম্পানি রিলোকেশন সুবিধা তারা বেশি পাবে। এতে দেখা যাবে বাংলাদেশ যদি আরসিইপিতে অতি শিগিগর যোগদান করতে না পারে তাহলে সামনের দিনে বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না। বলা প্রয়োজন যে, ২০২০ সালে ভিয়েতনামে, তাইওয়ানের বিনিয়োগ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ভারতে, তাইওয়ানের বিনিয়োগ হয় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে ১০৯টি দেশ ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে। সুতরাং, আরসিইপিতে যোগদান আমাদের করতেই হবে। বাংলাদেশ যেহেতু বিমসটেক এবং এপিটিএর সদস্য দেশ সেহেতু এ দুটি জোটের মাধ্যমে আরসিইপি জোটে প্রবেশ সহজতর হবে।
২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশ ‘নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। করোনা মহামারির কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ নেমে গেলেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ২০১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২০ সালের ৩০ জুনে ২ হাজার ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়াও পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর দেশের জিডিপি আরো ১ দশমিক ৫০ ভাগের কাছাকাছি বৃদ্ধি পাবে। এ সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানের মধ্যে কয়েক গুণ আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। এ মুহূর্তে দরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রিফারেনশিয়াল/ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে রপ্তানিতে ত্বরান্বিত করা যাতে ২০২৪ সালের পরে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হতে হয়।
n লেখক :ব্যাংকার এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক