দ্বিজাতিতত্ত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ ভারতবর্ষ। সম্প্রদায়-প্রীতি থেকে সাম্প্রদায়িক জালের ঘূর্ণাবর্তে তখন সমগ্র পাকিস্তান। ব্রিটিশ পিড়িয়ডের ভারতে সে বীজ ক্রমশ অঙ্কুরিত হচ্ছিল। অশোক কিংবা আকবরের ভারতকে কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, নেতাজি সুভাষ বসু, আব্দুল গাফফার খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের চেতনার রাজ্য থেকে তা নির্বাসিত। ভারতের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কংগ্রেস তখন মূলচেতনা থেকে একটু একটু করে সরে আসছিল। ফল ফলল উল্টো। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংকটে জর্জরিত ভারত জেনে শুনে বিষ পান করতে থাকল। এরই এক ফাঁকে একজন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত পরিপাটি স্যুট পরা, মাথায় কাশ্মিরি টুপি চাপিয়ে গোড়া মুসলিম সেজে বসলেন। তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। প্রথম দিকে তার ভূমিকা যদিও এমন ছিল না। তিনি কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতার সুযোগে বলে বসলেন—মুসলমানদের ভাগ্য জড়িত রয়েছে পাঁচটি শব্দের মধ্যে। আর তা হলো ‘দি মুসলিম আর অ্যা নেশন।’ ব্রিটিশ ভারতবর্ষের মুসলিমরা এক জাতি। তার এই এক জাতি তত্ত্বই অবশেষে দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্ম দেয়। কিন্তু দ্বিজাতিতত্ত্বই তার শেষ কথা ছিল না। ফলে দ্বিখণ্ডিত ভারত থেকে আলাদা ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার পরপরই তাকে বলতে শোনা যায়—‘পাকিস্তান রাষ্ট্রে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না; মুসলমান মুসলমান থাকবে না; সকলেই হবে পাকিস্তানি।’ যদিও বাস্তবে তার লেশমাত্র উপস্থিত ছিল না। ট্রাইবালদাঙ্গা, শিয়া-সুন্নি; পাঞ্জাবি-বেলুচ; বাঙালি-সিন্ধি বিরোধ সূচনালগ্নেই ধূমায়িত হতে থাকল।
ধর্মীয় মোহ থাকার পরেও ভাষার প্রশ্নে সেই ধূমায়িত আগুনের তেজে ক্রমশ জ্বলে উঠতে থাকল পূর্ববাংলা। পরবর্তী সময়ে দিন যত গড়িয়েছে, সিন্ধু-পদ্মা বেয়ে যত জল গড়িয়েছে; ততই সম্প্রীতির বন্ধন আলগা হতে হতে ধর্মীয় জাতিবিদ্বেষ থেকে জন্ম নিয়েছে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। সেই জাতীয়তা বাঙালি জাতীয়তা। ভাষার প্রশ্নে যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে পাকিস্তান ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে; ততই এক পাকিস্তানি চেতনার বাঁধন আলগা হচ্ছে। আর এতে নেতৃত্ব দিয়েছে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি। ড. কুদরাত্-ই-খোদা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ. ড. এনামুল হক ছিলেন নতুন এক চেতনার পথিকৃত্। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে, থেকে থেকে তখনো আগুন জ্বলেছে-নিভেছে; সেইসাথে পূর্ববাংলার মানুষের হূদয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ঘোর কাটিয়ে জমতে শুরু করেছে নতুন এক স্বপ্ন। নতুন এক ঠিকানা ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। খুব দ্রুত, খুবই আকস্মিকভাবে যে তা হয়েছে তা মোটেও নয়।
দেশীয় তথা বাঙালিদের মধ্যে যে ঘরের শত্রু বিভীষণরা ছিল, তারা উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা চায় পাকিস্তানকে মূল চেতনায় ফিরিয়ে নিতে। তাদের চেতনায় ভারতীয় ষড়যন্ত্র, দেশবিরোধী চক্রান্তের গন্ধ মেশানো থাকে। এতে করে এদের প্রেসক্রিপশনে বাংলা এলোপাথারি অযৌক্তিক সংশয়ের দোলাচলে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থায় দাঁড়ায়। সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষে জল ঢেলে একদল শুরু করে ধুতি-লুঙ্গি; জল-পানি, লোটা-বদনা বিতর্কিত তত্ত্ব। সেই তত্ত্বমতে ইসলামি গৌরবে ফেরা এবং হিন্দুর সকল কিছু বর্জন; যেমন : আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ভাষা-সংস্কৃতি পর্যন্ত। ভাষার মাঝে, হিন্দুগন্ধ খুঁজে বের করার প্রাণান্ত চেষ্টা চলল। ষাট লাখ টাকা খরচ করে আরবি; এবং রোমান হরফের বাংলা লেখার চেষ্টা ব্যর্থ হলো : তবু ক্ষান্ত হলো না তাদের অশুভ তত্পরতা। এমন এক প্রচেষ্টা ছিল ভারতবর্ষের ইংরেজদের, তারা ভারতীয় লিপিগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল; এই বলে যে, রোমান লিপি অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত। পরে অবশ্য বুদ্ধিমান ইংরেজগণ বুঝে নিয়েছিল বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করে লিপি পরিবর্তন যৌক্তিক নয়। চেষ্টা থেকে তারা সরে এসেছিল; কিন্তু পাকিস্তানপন্থিগণ কাণ্ডজ্ঞানহীন ঔদ্ধত্য ক্রমশ দেখাতে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তারা বর্ণমালায় ‘য’-এর স্থলে ‘জ’ করা; ন-বর্জন, যুক্তাক্ষর বর্জন করে ‘বিশ্ব’-এর পরিবর্তে বিশ্শ লেখা, ‘বিজ্ঞান’ এর বদলে ‘বিগ্যান’ ‘স্বামী’র পরিবর্তে শামী’, বর্ণের ওপর কার মাত্রা বর্জন; ফলা বর্জন, বর্ণের ডানে ‘কার’ চিহ্ন বসানো ইত্যাদি ভাবধারায় অগ্রসর হতে হতে, আইয়ুব খান নির্দেশিত ‘শ্রী’-এর স্থলে জনাব লিখতে গিয়ে, ‘জনাব জনাব দুর্গাপূজা’ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। এমন হাস্যকর কর্মযজ্ঞের পেছনের রহস্য ধরেছিলেন চিন্তামণি অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ। তাঁর মতে, ‘কোলকাতার ভাষা-বর্ণ-বানান অবিকৃত রাখলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাই যেন ব্যর্থ হয়ে যায়।’ তাই সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে চরম রক্ষণশীল ভূমিকা দিয়ে ১৯৪৭ সালের ‘দি মুসলিম আর অ্যা নেশন’-এর জোসটি-কে ফিরিয়ে আনার সেই প্রাণান্ত চেষ্টার লোক একেবারেই কম ছিল না। জনগণকে মুসলিম জোসে উন্মত্ত করে বলে এক উদ্ভট রাষ্ট্রের ঐক্য স্থাপনের চেষ্টায় পূর্ববাংলার শোষণের প্রক্রিয়া বেশি করে ঘনীভূত হতে থাকে। একদিকে ইসলামি জোস, অন্যদিকে শোষণ এমন দুধারি তলোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে বার বার। এত কিছুর পরেও বাঙালির ঘরে ফেরা সম্ভব হয়েছিল, চর্যার বৌদ্ধবাঙালি কবি, মধ্যযুগের আলাত্তল, আব্দুল হাকিম সহ চণ্ডীদাসের ধ্বনিত সেই কাব্যপ্রেম ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এমন অমোঘ উচ্ছ্বসিত বাণীর জন্য। যে বাণী ফল্গুধারার মতো বাঙালির রক্তনালী দিয়ে তির তির বয়ে চলছিল আবহমানকালের বঙ্গভূমি জুড়ে।