করোনার শঙ্কা কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চীন

শফিকুর রহমান রয়েল

 

একে তো বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্র এবং সর্ববৃহত্ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ, তার ওপর কোভিড-১৯ ভাইরাসের জন্মস্থান বিধায় ক্রমাগতই সইতে হচ্ছে সমালোচনার তির। এ দুইয়ের পাশাপাশি চলছে বৈশ্বিক মহামন্দা। সবকিছু মিলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি যে, এবার নির্ঘাত খাদে পড়বে চীনের অর্থনীতি। এমনও বলা শুরু হয়েছিল—দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি এবার উলটোদিকে যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু ২০২১ সালের এ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে সে আশায় গুড়ে বালি। সাময়িক ধীরগতিকে দূর করে চীনের অর্থনীতি ফিরে যাচ্ছে পুরোনো দ্রুততর প্রবৃদ্ধির যুগে। শিগিগর ফের ডাবল ডিজিটে পৌঁছানো হয়তো সম্ভব হবে না; কিন্তু চলতি বছরে বৃহত্তর অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে উচ্চপ্রবৃদ্ধির বিবেচনায় চীন থাকবে ২ নম্বরে। প্রথম স্থানটি দখল করবে ভারত। করোনায় আক্রান্ত প্রথম দেশ হয়েও সারা বিশ্বে যখন রোগটা ছড়িয়ে পড়ে, সেই সময়টায় উত্পাদনসক্ষমতাকে সচল রেখে এমনকি তা আরো বৃদ্ধি করে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় চীনের অর্থনীতি। ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সামগ্রী (পিপিই), কম্পিউটার থেকে শুরু করে সবকিছুই তাদের ২০২০ সালের অর্থনৈতিক পরিত্রাণে সহযোগিতা জুগিয়েছে। আর তারই সঙ্গে আভাস দিচ্ছে ২০২১ সালেও দৃঢ় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার। অথচ গত বছরের শুরুর দিকের লক্ষণসমূহ অর্থনৈতিক নিমজ্জনের শঙ্কাটাকে বেশ প্রবলরূপেই ফুটিয়ে তুলেছিল।

প্রাক্কলন অনুযায়ী চীনের অর্থনীতি চলতি বছরে আরো প্রসারিত হওয়ার কথা। এসব বিষয়ই তাদের অর্থনীতিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে পুনরায় আগের অবস্থানে চলে যাওয়ার। অন্য বড় অর্থনীতির দেশগুলো ২০২০ সাল পর্যন্ত তো বটেই, এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভাইরাস আরো ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একের পর এক বন্ধ করে দিচ্ছে, সে জায়গায় চীনের অর্থনীতির ২০২০ সালে শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। এমন এক সময়ে এটি ঘটল, যখন বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল—বৃহত্ অর্থনীতিগুলোর ২০২০ সালে সত্যিকার অর্থে হ্রাস ঘটার পর বহু বছরের নৈঃশাব্দিক প্রবৃদ্ধির নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালে চীনের ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশ সন্তোষজনক, কারণ তাদের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) প্রথম প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে আরো বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। বছর শেষ প্রান্তিকটির সমাপ্তিকে মধুরই বলা চলে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তার পরেও অবশ্য মানতে হবে যে, করোনা চীনের দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে আঘাত হানায় নিজস্ব মান অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি ঘটাতে পারেনি তারা। আবার এটিও সত্য, উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি চীনকে সবার আগে নিয়ে গেছে, করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থানে।

উত্পাদন সক্ষমতাকে ধরে রাখা এবং তাকে বাড়িয়ে তোলার পেছনে অন্য দেশের নির্ভরশীলতার চেয়ে বেশি কাজ করেছে নিজেদের চাহিদার হ্রাস না পাওয়াটা। করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়াতে অন্য দেশের উত্পাদন কমে গিয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে সাপ্লাই চেইন। এই সুযোগে পিপিই ও অন্যান্য তৈরি সামগ্রীর ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইন ও উত্পাদন সক্ষমতার ওপর ভর করে চীন আগের মতোই বনে যায় বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্লোর। ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে ২০২১ সালের চীনের অর্থনীতির জন্য ভালো কিছুই অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রাক্কলন করেছে, এ বছর চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের হবে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, আর ভারতের ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি উন্নয়নের অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি চীনে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগও ঘটবে অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। চীন যদি তাদের নিজস্ব নীতিগুলোর আরো সংস্কার ঘটায়, তাহলে প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে আবার ডাবল ডিজিটে পৌঁছাটা মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার হতে পারে। বিরূপ অবস্থাতেও অর্থনীতিকে দৃঢ় রাখাটাই এর বড় প্রমাণ।  —উইকিপিডিয়া অনুসরণে