আধুনিক জীবনের প্রাণভোমরা হইল বিদ্যুত্শক্তি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্শক্তি ব্যতীত নাগরিক জীবন পদে পদে হোঁচট খায়। বর্তমান সরকার বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ব্যাপারে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি তত্পর। পত্রিকা মারফত আমরা প্রায়শই বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রার চমকপ্রদ সংবাদ দেখিতে পাই। ২০৪১ সালের মধ্যে সরকার ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা অর্জন করিবার লক্ষ্যে কাজ করিতেছে, বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানিগুলি ইতিমধ্যেই সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে লইয়াছে, সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হইয়াছে। নিঃসন্দেহে এইগুলি খুব ভালো খবর। লক্ষ্যমাত্রা বহু ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময়ে পূরণ হয় না। তবে যেইটুকু পূরণ হয়, তাহাও প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু বিদ্যুতের অপচয় ও বকেয়া বিল এই খাতটিকে অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ণতর শক্তিতে বিকশিত হইতে দেয় না। পিছন হইতে টানিয়া ধরে। গত শুক্রবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রধান প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, দেশে দীর্ঘসময় ধরিয়া বিদ্যুত্ বিল বকেয়া রাখিতেছে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলি। দেখা গিয়াছে, সাধারণ ও বেসরকারি খাতের গ্রাহকরা গড়ে পৌনে দুই মাসের বিল বাকি রাখিতেছেন। অন্যদিকে, সরকারি, আধাসরকারি ও স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলি পর্যায়ক্রমে প্রায় সাড়ে ছয় মাস, পৌনে ছয় মাস এবং পৌনে ১৭ মাসের বিল বকেয়া রাখিয়াছে। অর্থাত্ বিদ্যুত্ বিল আদায়ের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারিতেছে না বিতরণ সংস্থাগুলি।
জানা গিয়াছে, দেশে বর্তমানে ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুত্ বিতরণ করিতেছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত এই কোম্পানিগুলির এবং বিদ্যুত্ বিভাগের হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, সকল মিলাইয়া ৭ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা বিদ্যুত্ বিল বকেয়া রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা বকেয়া রাখিয়াছে সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিদ্যুত্ বিল বকেয়া থাকিলে নিয়ম অনুযায়ী তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লওয়া হয় বটে। এই কারণে বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি বিশেষ বিপদে না পড়িলে বিদ্যুত্ বিল বকেয়া রাখিতে চাহে না। কিন্তু সরকারি কিংবা আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলি কেন বিদ্যুত্ বিল বকেয়া রাখিবে? এই খরচের খাতে তাহাদের নির্দিষ্ট বাজেট রহিয়াছে। সেই টাকা তাহারা কোথায় ব্যয় করেন? তাহাদের মধ্যে কেন নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুত্ বিল পরিশোধে অনীহা কিংবা উদাসীনতা থাকিবে? সরকারি প্রতিষ্ঠান বলিয়া কি এই ক্ষেত্রেও তাহাদের সমন্বয়হীনতার উদাহরণ সৃৃষ্টি করিতেই হইবে? প্রকৃতপক্ষে সরকারের নিজের প্রতিষ্ঠানসমূহে এই সকল বকেয়া ঠিকমতো আদায় না হইবার কারণে বিদ্যুত্ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির দায়ভার পরোক্ষভাবে চাপিয়া বসিতেছে জনগণের উপর।
স্পষ্টতই দেশের বিদ্যুত্ খাতের অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা বকেয়া বিল। সময়মতো বিল পরিশোধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির এই ‘অনীহা’র কারণে গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি সৃষ্টি করিতে ব্যর্থ হইতেছে বিদ্যুত্ বিতরণে নিয়োজিত বোর্ড-কোম্পানিগুলি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশা করিতেছে, স্মার্ট ও প্রিপেইড মিটার পুরাপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে বকেয়া লইয়া অস্বস্তি বহুলাংশে দূর হইবে। বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন ও প্রিপেইড মিটার স্থাপনে অনেকগুলি প্রকল্প চলমানও রহিয়াছে বটে। তবে বকেয়া বিলের এই সমস্যা কিন্তু অনেক পুরাতন এবং দৃশ্যত মনে হইতেছে—এই সমস্যা সহজে যাইবার নহে। নিয়ম তো সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমান হওয়া উচিত। সরকার কেন তাহার নিজের প্রতিষ্ঠানগুলিকে বকেয়া বিল পরিশোধের নিয়ম-ধর্ম পালনে উত্সাহিত করিতেছে না? এই ক্ষেত্রে ‘আপনি আচারি ধর্ম পরকে শেখাও’ প্রবাদটি স্মরণে রাখা উচিত।