পৃথিবী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সেইসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ, দেশ, জাতি। ব্যবহারিক জীবন, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে এগিয়ে যাওয়া জীবনকে সহজ করার লক্ষ্য। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, আমরা সত্যি কতটা এগুতে পেরেছি! কিছু কিছু বিষয়ে আমরা বরং পিছিয়ে গিয়েছি। যেমন চারদিকে আজ চরম নৈতিক অবক্ষয়, কিছু মানুষের আচরণে মনে হচ্ছে আমরা যেন আদিম যুগে ফিরে গিয়েছি। মানুষ ভুল আর শুদ্ধের সঠিক সংজ্ঞার ব্যাপারেই যেন আজ দ্বিধাযুক্ত। এর কারণ কী?
একটা শিশু জন্মের পর আমরা তাকে কতটা সঠিক শিক্ষা দিতে পারছি, উন্নত মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য! তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছি এবং শিশুদেরও সেই পথে ঠেলে দিচ্ছি। ফলস্বরূপ দেখতে পাচ্ছি, একটি শিশু শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছে যাওয়ার পর মা-বাবা এবং পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে তাদের বিশাল একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। একটা শিশু জন্মের পর নরম কাদামাটির মতোই থাকে, তাকে সঠিক পরিচালনায় বেড়ে উঠতে দেওয়া উচিত। কিন্তু আজ আমরা বাচ্চাদের কতটুকু সময় দিচ্ছি, অথবা দিতে পারছি। নিজেরাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি বেশিরভাগ সময়। শিশু অবস্থায় বাচ্চাদের দিকে খেয়াল না করে, কৈশোরে অথবা যৌবনে তাদের কোনো অসংগতি যদি আমরা শাসন করতে যাই, তারা সেটা মেনে নিতে চায় না। সে এ অবস্থায় তার নিজের জগত্ নিয়েই সুখী হতে চায়, নিজস্ব আনন্দ লাভের মাধ্যম সে বের করে ফেলে, সেটা বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে হোক, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে হোক অথবা কোনো অনৈতিক কাজে হোক। এর জন্য দায়ী আসলে আমরা অর্থাত্ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কেউ এর দায়ভার এড়াতে পারে না।
প্রগতিশীল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, নৈতিকতা ভুলে যেতে হবে। তরুণেরা অবশ্যই এগিয়ে যাবে, কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে প্রবীণদের সাহায্য ছাড়া তাদের এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাদের উন্নতির শিখরে আরোহন করার পেছনে প্রবীণেরাই কাজ করেছেন। নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে আজকাল নবীনদের কাছ থেকে কথা শুনতে হয়, ব্যাকডেটেড। তবে কি আগের মানুষেরা সব ভুল শিক্ষায় বড় হয়েছেন! মেনে নিলাম প্রাতিষ্ঠানিক অথবা প্রকৃত জীবনবোধের অভাবে প্রাচীন আমলে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত ছিল, প্রগতিশীল হওয়ার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই সেইসব কুসংস্কার অথবা অপসংস্কৃতি বিসর্জন দিতে হবে, কিন্তু নৈতিকতা ভুলে গেলে চলবে না। আজকালকার কিশোর অথবা তরুণেরা প্রকৃত চরিত্র গঠনের জন্য কতটুকু শিক্ষা পাচ্ছে! আমরা তাদের চরিত্র গঠনের সঠিক শিক্ষা দিতে পারছি না। ফলস্বরূপ উঠতি বয়সে ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় আমরা যেমনটি পড়েছি—স্বাস্থ্য গেলে ফিরে পাওয়া যায়, সম্পদ গেলে ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু চরিত্র একবার গেলে ফিরে পাওয়া যায় না। দুঃখজনক যে তরুণ প্রজন্মের মাঝে চরিত্রের সঠিক সংজ্ঞা আমরা পৌঁছে দিতে পারছি না। আজকাল পারিবারিক, সামাজিক অথবা ধর্মীয় শিক্ষায়, শুদ্ধ অথবা ভুলের পার্থক্য, উন্নত চরিত্র গঠন ইত্যাদি বিষয় অবহেলিত হতে দেখা যায়। বরং অনেক সময় উস্কানিমূলক দিক-নির্দেশনা দিয়ে তাদের বিপথে ঠেলে দিতে দেখা যায়। এর ব্যতিক্রম যে নেই তা বলব না, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কিশোর অথবা তরুণেরা আমাদেরই সন্তান, তাদের আলোর পথ বাতলে দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব। মানুষ যন্ত্র নয়। প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রা একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। কিন্তু সঠিক পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং জাতীয় শিক্ষায় তাদের প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার ভিত্তিমূল তৈরি করে দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব। ভালো কাজকে আমরা অনুসরণ করব, কোনো অসংগতির কাজে নয়।
সৌদি আরব