গল্পকথায় পদার্থবিজ্ঞান নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, ব্ল্যাকহোল

মাধব রায়, গল্পকার-প্রাবন্ধিক

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

 

আজকে অফিস থেকে ফিরে নীলকান্তবাবু সবাইকে নিয়ে ছাদে চলে এলেন। একটা বিশেষ ফল কিনে এনেছেন, পানিফল। ছোটবেলা তিনি বাড়িতে খেতেন। গ্রামে একে সিংড়া বলা হতো। তিনটে বা চারটে কাঁটাওয়ালা পানিফল। খুব সুমিষ্ট এবং পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। ছেলেমেয়েরা হয়তো এটি দেখেইনি। কমলা বললেন-তিনিও এটি খেয়েছেন এবং মজা পেয়েছেন। আজকে হঠাত্ করেই ফেরিওয়ালার কাছে পেয়ে নীলকান্তবাবু কিনে এনেছেন। তবে আফসোস সবগুলো বাকল ছোলানো। সম্পূর্ণ ফলটা কেমন দেখতে, বাচ্চা-কাচ্চাদের দেখাতে পারলেন না।

কমলা বললেন-ভালোই করেছ, আস্ত ফল কিনে আনলে বাকল ফেলাটা একটা মহা ঝামেলার বিষয় হয়ে যেত। তখন খাওয়ার চেয়ে কষ্ট বেশি হতো।

নীলকান্তবাবু বললেন-আমি ফেরিওয়ালার ভ্যানে অনেক খুঁজেছি, অন্তত একটাও যদি আস্ত ফল আনা যেত, তাহলে দেখানো যেত। কী আর করা।

কমলা একটা পে­টে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে কণিকার হাতে দিলেন, ছাদে চলে যা, আমিও আসছি।

সবাই মিলে আড্ডা জমেছে ছাদে। পানিফল খেতে খেতে আকাশ বলল-একটা গান হলে মন্দ হয় না।

রেখা বলল-ইশ, আমি গান গাইতে থাকি, আর তোমরা পানিফল খেয়ে শেষ করে ফেলো।

নীলকান্তবাবু হেসে বললেন-না, না, তোর জন্য আলাদা করে রেখে দিচ্ছি, তুই গান শেষ করেই খাবি, এই যে রাখলাম।

রেখা গান ধরল-               আকাশ হতে খসল তারা,

                                    আঁঁধার রাতে পথ হারা।

                                    প্রভাত তারে খুঁজতে যাবে

                                    ধরার ধুলায় খুঁজে পাবে

                                    তৃণে তৃণে শিশির ধারা।

গান শেষ হলে হাততালি দিলো আকাশ। দেখাদেখি সবাই।

নীলকান্তবাবু বললেন-রবীন্দ্রনাথ গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ বাতাস নিয়ে অনেক গান লিখেছেন।

আকাশ বলল-আমি ভাবছি অন্য কিছু।

কী? কমলা বললেন। তিনিও ছাদে এসে বসেছেন।

আমি ভাবছি গ্রহ নক্ষত্র এগুলো কীভাবে সৃষ্টি হলো।

তাই তো, বললেন কমলা। কীভাবে সৃষ্টি হলো বলো দেখি-নীলকান্তবাবুকে বললেন।

রেখা গান শেষ করে পানিফলগুলো খেতে শুরু করল। নীলকান্তবাবু খেতে খেতে বললেন-নক্ষত্র আসলে কোনগুলো?

সবাই উপরের দিকে তাকাল। চমত্কার জ্যোছনাময় আকাশ। চাঁদ, তারারা জ্বলজ্বল করছে। বিন্দু দেখিয়ে দিলো-ওইগুলো নক্ষত্র।

নীলকান্তবাবু বললেন-ওইগুলো বললে তো হবে না। যেগুলো মিটমিট করে জ্বলছে সেগুলো তারা বা নক্ষত্র। সেগুলোর নিজস্ব আলো আছে।

আর বাকীগুলো? সীমা বলল।

যেগুলো স্থিরভাবে জ্বলছে, সেগুলো গ্রহ। নির্দিষ্ট তারা বা নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এদের নিজস্ব আলো নেই।

আমাদের সূর্যেরও তো নিজস্ব আলো আছে। বলল আকাশ।

হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু। তার মানে হচ্ছে সূর্যও একটা নক্ষত্র।

সূর্যও একটা তারা? অবাক হয়ে তাকাল সীমা।

নীলকান্তবাবু বললেন, হ্যাঁ, সূর্যও একটা তারা।

আকাশ বলল-কিন্তু এই তারাগুলো কীভাবে সৃষ্টি হলো?

নীলকান্তবাবু শুরু করলেন-বিগব্যাং এর পর একটা সময় বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে শীতল হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও অন্যান্য গ্যাসের পরমাণু ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল। একে বলা হয় গ্যাসের ধুলিমেঘ। এতে প্রায় 75% হাইড্রোজেন, 24% হিলিয়াম এবং বাকি 1% কার্বন, নাইট্রোজেন অক্সিজেন ও অন্যান্য গ্যাস। মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ধুলিমেঘ আস্তে আস্তে জমাট বাঁধতে থাকে। ফলে এদের মধ্যে দূরত্ব কমতে থাকে এবং পরমাণুর মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। ফলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। দূরত্ব কমতে থাকায় স্থিতিশক্তি কমতে থাকে এবং গতিশক্তি বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় গ্যাসপিণ্ড থেকে শক্তির বিকিরণও বাড়তে থাকে এবং ক্ষীণ আলো নির্গত হয়। তাপমাত্রা যখন এক কোটি ক্যালভিন এর কাছাকাছি পৌঁছায়। তখন ফিউসন বিক্রিয়া শুরু হয় এবং অধিক পরিমাণে শক্তি উত্পন্ন হয়। এই শক্তি কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসে। ফলে গভীর বহিঃমুখী চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ মহাকর্ষ সংকোচনকে বাঁধা দেয়। বহিঃমুখী চাপ ও মহাকর্ষ সংকোচন বল যখন সাম্যাবস্থায় পৌঁছায় তখনই একটি স্থায়ী এবং পূর্ণ তারকা সৃষ্টি হয়।

চন্দ্রা বলল-বুঝলাম না, হাইড্রোজেন-হিলিয়াম দিয়েই তারা তৈরি হয়ে গেল?

নীলকান্তবাবু বললেন-কেউ বোঝনি? সবার দিকে তাকালেন। সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। তিনি আবার বললেন, তাহলে আরও একটু ব্যাখ্যা করেই বলি-এর আগে এক গ­াস পানি খেতে হবে, গলা শুকিয়ে এসেছে।

বিন্দু বলল, আমি নিয়ে আসছি।

পানি খেয়ে নীলকান্তবাবু আবার শুরু করলেন-মহাকর্ষ আকর্ষণ আর বহিঃমুখী চাপ যখনই সমান হয়, তখনই গ্যাসপিণ্ড একটা স্থিতাবস্থায় আসে। তখনই নক্ষত্রের জন্ম হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় বামন নক্ষত্র (Dwarf Star)। মোট নক্ষত্রের 90%-ই এরকম, এমনকি আমাদের সূর্যও। কিন্তু তুমি বলেছ, আকাশ বলল-হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। যদি হাইড্রোজেন শেষ হয়ে যায়?         পরের অংশ আগামীকাল