রিয়াদ হোসেন
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইউরোপে গত ২০২০ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে গেছে ব্যাপকহারে। ২৭ দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বা ২৪৯ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ অন্তত ২১ হাজার কোটি টাকা। ইউরোপের দেশগুলোতে তৈরি পোশাক পণ্য আমদানির তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউরোস্ট্যাটের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে। রপ্তানি কমলেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ চীনের পরেই পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারকের স্থান দখলে রেখেছে। যদিও প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের চেয়ে ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে অপেক্ষাকৃত বেশি হারে।
ইউরোস্ট্যাটের হিসাবে, গত বছর ইউরোপের দেশগুলো বিশ্ববাজার থেকে পোশাক পণ্য আমদানি করেছে ৭ হাজার ৩০৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের। আর আগের বছর (২০১৯ সাল) আমদানি করেছিল ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের। অর্থাত্ করোনার বছরে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে আমদানি কমেছে ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বা ১ হাজার ৬৩৮ কোটি ডলারের।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, আগামী মাসগুলোতেও রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরতে আগামী জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর পর থেকে রপ্তানি বাড়তে পারে বলে আশাবাদী তারা।
ইউরোপে শীর্ষ ১০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় চীন ও বাংলাদেশের পরে রয়েছে যথাক্রমে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ইউরোস্ট্যাটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ওটেক্সার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছর ইউরোপের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে বেশি হারে। অন্যদিকে উভয় দেশে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীনের রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে আলোচ্য বছরে ৩৯ শতাংশ কমলেও ইউরোপের বাজারে কমেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাত্ ইউরোপের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে বেশি হারে। বিশেষজ্ঞরা এজন্য করোনার পাশাপাশি উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধকেও দায়ী করছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি পৌনে ১২ শতাংশ হারে কমলেও প্রায় ১৫ শতাংশ হারে কমেছে ইউরোপের বাজারে। অথচ আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশ আর ইউরোপের পোশাক আমদানি কমেছে সোয়া ১৮ শতাংশ হারে। অর্থাত্ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি তুলনামূলক বেশি হারে কমেছে। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চীন ছাড়াও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি হারে রপ্তানি করেছে তুরস্ক, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে বাংলাদেশের চেয়েও তুলনামূলক রপ্তানি পরিস্থিতি খারাপ ছিল ভারত, কম্বোডিয়া, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়ার।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, আগামী মাসগুলোতেও ভালো রপ্তানির আদেশ নেই। ফলে কেবল টিকে থাকার চেষ্টায় আছি।
অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, আশার কথা হলো করোনা ভাইরাসের টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে স্বাভাবিক গতি আসতে চলতি বছরের অর্ধেক সময় পার হয়ে যেতে পারে। এর পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।