শহিদ স্মৃতি অমর হউক

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তাবোধের জাগ্রত চেতনা হইতে উত্সারিত একটি দিন। এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষার তাগিদে বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করিয়াছিলেন বাংলার দামাল তরুণেরা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’—এই স্লোগান দিতে দিতে তাহারা ঘাতকের বুলেটের সম্মুখে বুক পাতিয়া দিয়াছিলেন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না-জানা অনেক শহিদ বুকের রক্তে রঞ্জিত করিয়াছিলেন ঢাকার রাজপথ। তাহারা পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক-শাসকদের বুঝাইয়া দিয়াছিলেন বাংলা ও বাঙালি এক অবিচ্ছিন্ন সত্তা। অমর সেই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইতে বাঙালি আজ ছুটিয়া যাইতেছেন শহিদ মিনারে। পুষ্পে পুষ্পে ভরিয়া যাইতেছে দেশের সকল শহিদ মিনার। শহিদ মিনার রূপ লইতেছে স্মৃতির মিনারে। আজ সেই মহান শহিদ দিবস, শুধু আমরা নই, সমগ্র বিশ্বই পালন করিতেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। গভীর শ্রদ্ধা জানাইতেছে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি। ইহার চাইতে গৌরব ও আনন্দের বিষয় আর কী হইতে পারে! আমরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি জানা-অজানা সেই সকল  বীর শহিদকে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলা ও বাঙালির প্রতি যে অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি, একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা ছিল তাহারই প্রবল প্রতিবাদ। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধের চেতনা হইতে উত্সারিত সেই আন্দোলন ক্রমে ধাবিত হইয়াছিল স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ‘৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬-এর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ ও ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিকে শক্তি ও সাহস জোগাইয়াছে একুশের চেতনা। অবশেষে বাঙালি জাতি সফল হইয়াছে। তাহারা ছিনাইয়া আনিয়াছে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। এইভাবে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙিতে সাহায্য করিয়াছে। প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে আত্মনিবেদনের এই দিনটি আমাদের জন্য তাই অনুপ্রেরণাস্বরূপ। মাতৃভাষা ছাড়া জ্ঞানচর্চা কখনো পূর্ণতা লাভ করে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘কোনো শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে চাইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঘটনার এত বত্সর পরও (প্রায় সাত দশক) মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছাইয়া আছি।’

বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পাইয়াছে বটে; কিন্তু তাহা কি সর্বস্তরে চালু করা সম্ভব হইয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক নহে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বাংলা চালু হইলেও বাংলা এখনো উচ্চশিক্ষার বাহন হয় নাই। বিজ্ঞান, চিকিত্সাশাস্ত্র, প্রকৌশলসহ বহু বিষয়ে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করা সম্ভব হয় নাই। অথচ জাপান, কোরিয়াসহ বহু উন্নত দেশ মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার সকল দরজা খুলিয়া দিয়াছে। সরকারি কাজকর্মে বাংলা চালু থাকিলেও ব্যবসায়-বাণিজ্য, গবেষণাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইংরেজি প্রাধান্য পাইয়া আসিতেছে। বাংলায় আইন প্রণীত হইলেও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা চালু হয় নাই। যদি আমরা নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে দাবি করি, তাহা হইলে শিক্ষা, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আমাদের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে এবং দ্রুততম সময়ে তাহা বাস্তবায়ন করিতে হইবে। পরিভাষা, অভিধানসহ সম্ভাব্য সকল উপকরণ সহজলভ্য করিবার মাধ্যমে ভাষাচর্চার পরিবেশ তৈরি করিতে হইবে। ইহাই  হইতে পারে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রেষ্ঠ উপায়। আমরা একুশের শহিদদের প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। শহিদ স্মৃতি অমর হউক।