কোম্পানি পরিচালনা করলেও কৌশলে করের আওতার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক কোম্পানির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে গঠিত এনবিআরের বিশেষ টাস্কফোর্স কোম্পানিগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অভিযানে নামে। এর ফলে নতুন করে প্রায় ৫৮ হাজার কোম্পানি করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন নিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাত্ এসব কোম্পানি এখন করের আওতায় আসল। কোম্পানিগুলোকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। ফলে তাদের আয়ব্যয় এনবিআরের নজরদারির মধ্যে আসার সুযোগ তৈরি হলো।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে কোম্পানির নিবন্ধন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আরজেএসসির হিসাবে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন রয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০টির। এর মধ্যে এতদিন টিআইএন ছিল ৭৮ হাজার কোম্পানির। আর করের আওতার বাইরে ছিল ৯৮ হাজার ৪০০ কোম্পানি। অন্যদিকে টিআইএন থাকা কোম্পানির মধ্যে ২০১৯-২০ করবর্ষে মাত্র ২২ হাজার ৮৪৯টি কোম্পানি আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দিয়েছে। অর্থাত্ নিবন্ধিত কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ কোম্পানি রিটার্ন জমা দিত। বাদবাকি কোম্পানিগুলো রিটার্নও জমা দিত না।
ইস্যুটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। অবশেষে গত বছরের শুরুর দিকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় এনবিআর। এ লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স গত কয়েক মাস ধরে দেশব্যাপী আরজেএসসিসহ বিভিন্ন উত্স থেকে কোম্পানিগুলোর তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করে। ঐ টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) পরিচালক মো. শব্বির আহমদ। সূত্র জানায়, ঐ টাস্কফোর্স এ লক্ষ্যে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করে। এরপর টিআইএন না থাকা কোম্পানিগুলোকে চিহ্নিত করতে কাজ শুরু করে এবং কোম্পানিগুলোকে টিআইএন নিতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য এর মধ্যে কিছু কোম্পানি নিজেরাই টিআইএন নিতে সম্মত হয়। ফলে গত কয়েক মাসে সবমিলিয়ে ৫৭ হাজার ৫৩৫টি কোম্পানি করের আওতায় আসে।
এর ফলে আরজেএসসির নিবন্ধিত ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০ কোম্পানির মধ্যে এখন টিআইএন তথা করের আওতায় আসল ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি কোম্পানি। এসব কোম্পানির তথ্য এখন এনবিআরের নজরদারির আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হলো।
সবমিলিয়ে নিবন্ধিত কোম্পানির এখন প্রায় ৭৭ শতাংশ করের আওতায় আসল। আর করের আওতায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭০ শতাংশই এনবিআরের নজরদারির মধ্যে এসেছে।
যোগাযোগ করা হলে টাস্কফোর্সের প্রধান মো. শব্বির আহমদ নতুন করে ৫৭ হাজার কোম্পানি টিআইএনের আওতায় আসার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন এনবিআরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অনেক কোম্পানি স্বেচ্ছায় টিআইএন নিয়েছে। এছাড়া রিটার্ন দেওয়ার হারও গত কয়েক মাসে অনেক বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতের বছরগুলোতে গড়ে কোম্পানির রিটার্ন দাখিল এক শতাংশ হারে বাড়লেও এবার এক লাফে তা ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশে বিপুলসংখ্যক কোম্পানি নিবন্ধিত হলেও তার বেশির ভাগই বছরের পর বছর ধরে করের আওতার বাইরে থাকা নিয়ে অনেক আলোচনা চলছিল। আবার যেসব কোম্পানি রিটার্ন জমা দিত, তার মধ্যেও অর্ধেকের মতো কোম্পানি ভুয়া অডিট রিপোর্ট জমা দিত বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে এনবিআর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতো। অন্যদিকে এ খাতে বিশৃঙ্খলাও ছিল। এনবিআরের বর্তমান প্রশাসন এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই বদলে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট। কেবল করের আওতায় আনা নয়, ভুয়া অডিট রিপোর্ট জমা দিয়ে কর ফাঁকি বন্ধ করতে অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ের উদ্যোগও নেয়।
এনবিআরের এক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, যে পদ্ধতিতে কাজ চলছে, তাতে আগামীতে কোনো কোম্পানির পক্ষে করের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ থাকবে না। আগামী এপ্রিল নাগাদ শতভাগ নিবন্ধিত সক্রিয় কোম্পানি করের আওতায় আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, কোনো কোম্পানি নিবন্ধিত হলে তার টিআইএন নেওয়া ও বছর বছর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ব্যতিক্রম হলে জরিমানা এমনকি জেলেরও বিধান রয়েছে।