আলোচনা নাচ গান কবিতায় ভাষাশহিদদের স্মরণ

ইত্তেফাক রিপোর্ট

শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে ভাষাশহিদদের। গতকাল গানের সুরে, কবিতার ছত্রে, নৃত্যের ছন্দে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শিল্পীরা।

শিল্পকলা একাডেমি :গতকাল বিকালে ‘বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষা করবে বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে নাচ, গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব মো. বদরুল আরেফীন। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

সম্মিলিত কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির মধ্য দিয়ে আয়োজনের সূচনা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি করেন নেপাল দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ড. বানশিধার মিশ্রা, রাশিয়ান দূতাবাসের ওলগা রায়, সঙ্গীত পরিবেশন করেন অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের হাই কমিশনার জেরিমি ব্রুয়ার, জাপানের মেই ওয়াতানাবে ও শুনসুন মিজুতুয়ানি, কোরিয়ান নানঘেকিম, নৃত্য পরিবেশন করেন ঢাকাস্থ ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের সুলগ্ন বর্মন, রাজোন্যা চৌধুরী, নেহা ভাইড এবং আনশি আঘারাওয়াল।

অনুষ্ঠানের নৃত্য ও সংগীতের বিভিন্ন পর্বে আরো অংশ নেয় মরক্কো, মালয়েশিয়া, ফিজি, শ্রীলঙ্কা, নেদারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, নেপাল, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, কুবা, মোজামবিক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, ভুটান, ব্রুনাই, পাকিস্তান, ইউক্রেন, ইতালি, চায়না, ভানুয়াতু, জাপান, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, পাপুয়া নিউগিনি, মালদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, মিশর, ফিলিপাইন, পূর্ব তিমুর, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়া, আমেরিকা এবং বাংলাদেশের ভাষায় শিল্পীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।

লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা ও নির্দেশনায়, ইয়াসমিন আলীর সংগীত পরিচালনায়, সৈয়দা সাহেলা আহমেদ লিমার নৃত্য পরিচালনায় ঢাকা সাংস্কৃতিক দলের সংগীত শিল্পী এবং ভঙ্গিমা নৃত্য দলের শিল্পীরা পরিবেশন করে ৪১টি ভাষায় ‘বিশ্ব মায়ের সুর সংগীত বাণী’ শীর্ষক সংগীত ও নৃত্য।

বাংলা একাডেমি :সকালে বাংলা একাডেমির আয়োজনে ছিল অমর একুশে বক্তৃতা। ‘ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য-স্মারক তালিকায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ :একটি সামাজিক ও যোগাযোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। আলোচনাসভার এ আয়োজনে ভাষাসংগ্রামী, গবেষক ও সাহিত্যিক আহমদ রফিককে প্রদান করা হয় জসীমউদ্্দীন সাহিত্য পুরস্কার-২০২১। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আহমদ রফিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারায় তার পক্ষে বাংলা একাডেমির সচিব এ এইচ এম লোকমান ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) নূরুন্নাহার খানমের হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য, সম্মাননা-স্মারক ও সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষাশহিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

জাতীয় জাদুঘর : শিশু-কিশোরদের বাংলা হাতের লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে জাতীয় জাদুঘর। এ ছাড়া জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনালয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক ও গ্রন্থের বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শিত হয় ভাষা আন্দোলনের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র। এ ছাড়া জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘বঙ্গবন্ধু ও একুশের চেতনায় লালিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাদুঘরের শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা সাঈদ শামসুল করীম। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগের কিপার নূরে নাসরীন, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগের কিপার ড. বিজয় কৃষ্ণ বণিক এবং ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগের উপকীপার এ কে এম সাইফুজ্জমান। সুন্দর বাংলা হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করেন জাদুঘরের মহাপরিচালক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান।

ছায়ানট : সন্ধ্যায় অনলাইনে গান, পাঠ ও আবৃত্তি সাজানো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছায়ানট। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয় এ অনুষ্ঠান। এ আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার, মাকসুদুর রহমান মোহিত খান, ফারজানা আক্তার পপি, দীপ্র নিশান্ত, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী প্রমুখ। জাতীয় সংগীতের সুরে শেষ হয় অনুষ্ঠান।

শিশু একাডেমি :বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কাজী রওশন আক্তার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক জ্যোতি লাল কুরী।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : ফেসবুক পাতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সে আয়োজনে ‘একুশের পথ ধরে স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। সূচনা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় বম, ত্রিপুরা ও মারমা নৃ-গোষ্ঠীর নৃত্য। মারমা, মুরং ভাষাসহ বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার মিশ্রণে সংগীত পরিবেশ করে ব্যান্ডদল এফ মাইনর। গারো ভাষায় সংগীত পরিবেশ করে ব্যান্ডদল সেক্রামেন্ট।