টেলিভিশনে দেখেছি, গত জুনের ভূতুড়ে বিলকে কেন্দ্র করে ডেসকোর বেশকিছু উপরস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাসপেন্ড/চাকুরিচ্যুতির খবর। বিদ্যুত্সচিব বলছিলেন ডেসকোর গ্রাহকগণ হলো প্রাণ, তাদের প্রতি এ ধরনের অন্যায় সহ্য করা হবে না। উচ্চতর আদালতের এক ঐতিহাসিক রায় অনুসারে, ডেসকো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান না হয়েও, তার কর্মচারীরা গণকর্মচারী বটে। তাই সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে সব সময়ে জনগণের সেবা করা তাদেরও কর্তব্য।
সকল সমাজে শিষ্ট লোকেরা যেমন আছে, দুষ্ট লোকদেরও অভাব নেই। শাসকদের উচিত, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে সচেষ্ট হওয়া। কিন্তু প্রভাব ও বিত্তশালীদের দাপটে অনেক সময় উলটোটাও হতে দেখা যায়। হিংসা, লোভ. অনুচিত স্বার্থ, অন্যায়ভাবে অধিক ফায়দা লোটার অভিপ্রায়ে চলে জোর-জবরদস্তি, ষড়যন্ত্র। পুলিশে ডায়েরি করে, পত্রিকায় ছাপিয়েও কোনো লাভ হয় না। আবার কোনো কোনো সময় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আইন/ রুলটাই অহেতুক নিজ সুবিধার্থে/সীমাবদ্ধতায় এমনভাবে তৈরি করে ফেলে, যা এসব অন্যায়কে ঠেকাতে সহায়ক হয় না।
গত মাসের প্রথমদিকে নিউ ইস্কাটনস্থ (গাউস নগর) ডেসকো অফিসে গিয়েছিলাম, আমরা যারা গ্রাহক হিসেবে আমাদের সব বিল পরিশোধ করা ছাড়াও, কমন বিল পরিশোধের লক্ষ্যে নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দিয়ে যাই, তাদের লাইন যেন অন্যদের কারণে কাটা না যায়, তার কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে জানতে/জানাতে। নির্বাহী প্রকৌশলী সাহেব বললেন ‘ওদের লাইন কেটে দেব, আপনি অমুক সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন।’ অমি জিগ্যেস করলাম, আমাদের লাইনকেই/বিলকেই ইনডিপেনডেন্টভাবে অবিমিশ্র আলাদা করা যায় কি না। তিনি বললেন, ‘আইনে নেই।’ বলেই কাজে বাইরে চলে গেলেন। যথারীতি যার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন তার সঙ্গে আলাপ করলাম। কোনো সমাধান হলো না। নির্বাহী সাহেব বাইরে থাকায় ওনাকে ফিডব্যাক দিতে পারলাম না। অগত্যা এসই/তেজগাঁও-এর সঙ্গে কথা বললাম। এক দিন পর জবাব দেওয়ার কথা বললেন তিনি। এক দিন পর বললেন, ‘অমুককে বলে দিয়েছি করে দিতে।’ সেই অমুক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বললেন, আইনের কারণে নির্বাহী সহেব রাজি হচ্ছেন না। আমাকে তার সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শও দিলেন। এক দিন পর তাই অফিসে গেলাম, দেখা পেলাম না। অগত্যা আবার তাকে জানালাম। তিনি আগের কথা থেকে সরে এসে বললেন, ‘কাজ তো নির্বাহী সাহেবই করবেন, তিনি রাজি না হলে হবে না।’ আমি বললাম, ‘ডেসকোর তো কোনো আইন থাকার কথা নয়, বড়জোর রুল কিংবা মন্ত্রণালয়ের নির্দশিকা আছে, আমাকে তা দেওয়া যায় কি না।’ তিনি আমার ইমেইল ঠিকানা রেখে বললেন পাঠিয়ে দেবেন। কয়েক দিন তৃতীয় সাহেব মারফত ওনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করি, কিন্তু আজ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
পানি, গ্যাস, টেলিফোন লাইনে অন্যদের ব্যর্থতা কিংবা অনিয়মের কারণে কোনো আলাদা গ্রাহকের লাইন কাটা যায় না। এসব লাইন আলাদা করা বরং কঠিন, তবে বিদ্যুত্ লাইন আলাদা করা সবচেয়ে সহজ। একটু বুদ্ধি করলেই কমন বিদ্যুত্, সিস্টেম লস ইত্যাদি বিষয়গুলোরও সমাধান করা যায়, যাতে একজনের কারণে অন্য গ্রাহকের লাইন কাটা না যায়। চাই শুধু বিদ্যুত্ সচিবের মতো আন্তরিক মানসিকতা, সংবিধানের আলোকে কর্মকর্তা পর্যায়ের আন্তরিকতা, চিন্তা ও চেতনা। একই আন্তরিকতা দিয়ে ঢাকা শহরের প্রচুর বহুমালিকানাধীন ভবনেরও উপকার করা সম্ভব।
প্রসঙ্গত, কনসালট্যান্ট হিসেবে আমার একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ কর্ম কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত/নির্বাচিত হয়ে রেলওয়েতে বেশ কয়েক বছর, একই কর্ম কমিশনের পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তড়িত্ কৌশল ও ইলেকট্রনিকস বিভাগে শিক্ষকতার চাকরি করেছি। শিল্পে, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছি বেশ কয়েক বছর, বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুেকাষ তৈরির উদ্যোগ পর্যন্ত নিয়েছিলাম। হিংসা/ষড়যন্ত্রের কারণে তা ভেস্তে যায়। তিন মন্ত্রণালয়ের তিন সচিব স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র মারফত বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনেও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করি।
আমি বুয়েট থেকে পাশ করা প্রকৌশলী হলেও, ছেলেবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী হয়ে মাতৃভূমির নাম উঁচুতে তুলে ধরার। সে চেষ্টা আমি এখনো করে যাচ্ছি। কিন্তু যে অভিজ্ঞতা ডেসকো থেকে পেয়েছি, তা যদি চলতে থাকে তাহলে কোনো দক্ষতা অভিজ্ঞতাই কাজে আসবে না।
n লেখক : বিজ্ঞানী, গবেষক