ঠক ঠক ঠক...
কে?
চিঠি।
কার চিঠি এলো? এই যে কৌতূহল, আকুলতা—এই অনুভূতির কোনো ভাষা নেই।
একটা সময় ছিল—মানুষের সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, পরিবেশ-পরিস্থিতি সবই চিঠিতে প্রকাশ করা হতো। প্রিয় মানুষের একটা চিঠির জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ সময় ধরে। একমাত্র চিঠিই ছিল তখন ভাবনা, উপলব্ধি ও যোগাযোগের পারস্পরিক সেতুবন্ধন। ডাকপিয়ন বিলি করে বেড়াতেন খাম-পোস্টকার্ড। খাম-পোস্টকার্ডে বড় বড় করে ঠিকানা লেখা থাকত। ডাকপিয়নরা সেই ঠিকানা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠি পৌঁছে দিতেন। এখন এসব যেন অতীত!
প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে, মানুষের কষ্ট কমেছে, অপেক্ষার অবসান হতে শুরু করেছে, কিন্তু চিঠি আদান-প্রদানের দিনগুলোর সেই আবেগকে ধরে রাখার কোনো ফর্মুলা প্রযুক্তি আমাদের দিতে পারেনি। ‘প্রযুক্তি মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’ কথাটি কোনো অংশেই মিথ্যে নয়। মানুষের এই আবেগ-অনুভূতির কত বিবর্তন, কত পরিবর্তন! কখনো কি আর আমরা ফিরে পাব হলুদ কিংবা সাদা খামে ভরা চিঠি খোলার সেই মিষ্টি অনুভূতি!
প্রিয় মানুষের হাতে লেখা চিঠির কালো অক্ষরগুলোয় কী মায়া, কী মমতা, কী মোহ, কী জাদু! শুধু চিঠিতে থাকা শব্দের ঘ্রাণ নিয়েই কত মানুষ কত রাত নির্জনে কাটিয়েছে, কত চোখ শুধু শব্দের পর শব্দের গাঁথুনির দিকে তাকিয়ে অশ্রু-সাগর বইয়ে দিয়েছে। চিঠির ভেতর প্রিয় মানুষের হাতে ছোঁয়া গোলাপি সুবাস, পাপড়ি কিংবা নববধূর চোখের জলভেজা কাজলের চিহ্নে যে আবেগ, মায়া, ভালোবাসা—তা আর নেই। আহা রে! চিঠি পাওয়ার সেই ব্যাকুলতা কই!
চিঠি সাহিত্যের একটা অংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ছিন্নপত্রে’ চিঠির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নতুন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে যতটা লাভ করি, চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরো একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। আমার মনে হয়, যারা চিরকাল অবিচ্ছেদে চব্বিশ ঘণ্টা কাছাকাছি আছে, যাদের মধ্যে চিঠি লেখালেখির অবসর ঘটেনি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণ করেই জানে।’
শেষ করব একটা আর্জি দিয়ে—চিঠিরা বাঁচুক, শব্দেরা বাঁচুক। কালি-কলম-মন, এই তিনের মিলন হোক আবার, একটা বিপ্লব হোক—চিঠির বিপ্লব।
প্রেরক: মুরাদুল মুস্তাকিম মুরাদ
শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়