ক্যাম্পাসের ছোট বড় সবার কাছে মীম নামেই পরিচিত শেখ শাহরিন সুলতানা মীম। ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই মীম প্রিয়মুখ। যে কোনো কালচারাল অনুষ্ঠানে প্রথমেই তার ডাক পড়ে। আর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তো থাকেই। সেজন্য সবাই মীমকে এক নামেই চেনেন। গানের পাশাপাশি তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসাহিত্যের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। গানকে সঙ্গী করেই ভবিষ্যতে অধ্যাপক হতে চান তিনি। তার ক্যাম্পাস ও গানের জীবনের আঁকাবাঁকা পথ নিয়ে লিখেছেন অরণ্য সৌরভ
অরণ্য সৌরভ
ডানপিটে স্বভাবের মীমের শৈশব কেটেছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার মহেশপুর গ্রামে। ২০০৭ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা শুরু করেন। সপ্তাহে দুদিন দুজন ওস্তাদের কাছে তালিম নিতেন। মীমের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখতেন সংগীতপ্রেমী নানা আব্দুর রশিদ তালুকদার। তিনিই তাকে সর্বপ্রথম ‘লালনকন্যা’ নামে ডাকতে শুরু করেন। একবার গান গাওয়া অবস্থায় তার ওস্তাদ বলেন, ‘লালনের গানে তুই অনেক দূর যেতে পারবি।’ এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তার গাওয়া ‘এক চোক্ষেতে হাসন কান্দে, আরেক চোক্ষে লালন’ গানটি ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। ‘লালনকন্যা’ উপাধি প্রসঙ্গে মীম বলেন, ‘প্রশংসা, খেতাব উপাধি কার না ভালো লাগে। আমিও ব্যতিক্রম নই; বরং নিজ নামের বাইরে আমার আরও একটা পরিচয় আছে—তাই এই উপাধিকে পরিচয় হিসেবেই ধারণ করি।’ গানের প্রতি অনুরাগের বিষয়ে মীম বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার ঘুমানোর সময় বাবা গান গাইতেন, সেখান থেকেই মূলত গানের শুরু হলেও ২০০৬ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা শুরু।’ লালন বা ফোক গানের প্রতি অনুরাগ প্রসঙ্গে মীম বলেন, ‘ফোক গানই তো শেকড়ের গান। মাটি ও মানুষের গান। ব্যথা, বেদনা, সুখ-দুঃখের খুবই সুন্দর মিশ্রণের নামই তো ফোক গান। তাই জীবনে ফোক গান বিশেষভাবে ধারণ করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘দাদাবাড়ি কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়াতে হওয়ায় বছরে দু’বার অন্তত যাওয়া হতো। আর কুষ্টিয়া গেলে লালনের আখড়াতে অবশ্যই যেতাম। সেখানে দেখতাম গানের আসর বসত, বাউলদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও গান করতে পারতেন। একবার আখড়াতে যাওয়ার পর কাঙ্গালিনী সুফিয়ার সঙ্গে ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ গেয়েছিলাম। এরপর থেকেই লালনের গানে নিজেকে আরো বেশী করে জড়িয়ে নিলাম।’ লালনের গান ও বাউলদের নিয়ে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে মীম বলেন, ‘লালনের মেলা হয়, কিন্তু বাউলদের মেলা হয় না। সেই মেলায় অনেক বাউলই আসতে পারে না। প্লাটফর্ম পায় না। যদি কোনোদিন সুযোগ হয় তবে বছরে একবার অন্তত বাউলদের নিয়ে মেলার আয়োজন করব। সবাই আসবে, গান করবে। নতুনদেরও আগমন ঘটবে এবং একটি প্লাটফর্ম পাবে।’ লালনকন্যা খ্যাত মীমের জীবনে অর্জনের ঝুড়িটা ভরপুর। ২০০৮ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় উপজেলায় মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান এবং জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এছাড়াও জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিকবার পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০১৫ সালে চ্যানেল আইয়ের ‘তারায় তারায় দীপশিখা’ অনুষ্ঠানে সারাদেশে তৃতীয়, ২০১৭ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীর স্বীকৃতি, বৈশাখী টিভিতে পদ্মকুঁড়ি অনুষ্ঠানে পরপর দু’বার বরিশাল বিভাগে প্রথম এবং বাংলার গান, ক্ষুদে গানরাজ, পাওয়ার ভয়েজ, মার্কস অলরাউন্ডে বরিশাল বিভাগ থেকে ইয়েস কার্ড লাভ করেন। ২০১৮ সালে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ফোক গানে তৃতীয় হওয়ায় ইবিতে দু’বার সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার বরিশালের লালনগীতির তালিকাভুক্ত শিল্পী। সেইসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালে বিটিভির ‘বৃত্তের বাইরে’ অনুষ্ঠানে দেশের গানেরও তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন।