আজ ২৫ জানুয়ারি ২০১৯ কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর মহাপ্রয়াণ দিবসে তাঁকে নিয়ে গদ্য
ইয়াকুব মালিক
সাহিত্যে এমন কিছু আছে, যেগুলো সম্পর্কে কোনো লেখা বা ব্যাখ্যা শেষ বা চূড়ান্ত নয়। মানব জীবনের অন্তহীন বহমানতা, তার জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন কখনোই হয়তো নিবারিত হওয়ার নয়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি জীবনের বিস্তৃত ক্যানভাসকে কখনো সম্পূর্ণ চিত্রায়িত করতে পারে না, শুরু বা শেষের প্রান্তবিন্দু মানব ইতিহাসে মীমাংসিত নয়, তবুও এর আরাধনার যেমন বিলয় নেই তেমনি আরাধ্যও যেন মরীচিকার মতো নিরন্তর সঞ্চরণশীল স্থান থেকে স্থানান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে। স্থান ও কালের কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে থেকে, তার বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে সে প্রেক্ষাপটে মানবকুলের যাপিত জীবনের পূর্বাপর সাহিত্যের বাঁধনে আবদ্ধ করার প্রয়াস এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রাই বটে। সকলে এ পথ মাড়ান না, বলাবাহুল্য বিরলপ্রজ যে মুষ্টিমেয় দু-একজন এ সাহস দেখান, শওকত আলী (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬—২৫ জানুয়ারি ২০১৮) তাঁদের অন্যতম।
তাঁকে ভুলে গেলে নিজেকেই ভুলে যাওয়া হয়। ‘আপন’ বা ‘নিজ’ বলতে কোনো সত্তা যদি নিজের মাঝে অনুভূত হয়, যদি জগত্-সংসার আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে মনে হয়, তবে মহান এ কলম কারিগরকে এড়িয়ে যাই কী করে! নৈরাশ্য, মূঢ়তা, হীনস্বার্থপরতা, নগদ প্রাপ্তির লোভে অমানবিক বিষয়জ্ঞানতাড়িত মানুষ অন্যকেই শুধু আক্রমণ করে তা নয়, একইসাথে নিজেও আক্রান্ত হয়, প্রবঞ্চিত হয় সভ্যতার ধ্বজাবাহী মানবতার জয়যাত্রা। প্রদোষ কালের মানুষেরাও মানুষ এবং তারাও সামজিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিভক্ত। যে বিভক্তি নিরন্তর অন্বেষণ করে চলেছে মানব মহিমার গুরুত্ব—তা কাল ও সমাজ নির্বিশেষ হয়ে একটি চিরন্তন জিজ্ঞাসাকে মূর্ত করে তুলেছে।
শওকত আলীর সাহিত্য সাধনার কাল কম-বেশি প্রায় অর্ধশত বছর, বৈশ্বিক ও জাতীয় রাজনীতিতে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ কালপরিক্রমায় ঘটেছে বিস্তর পরিবর্তন। বিশ্বাস ও সংস্কারে এসেছে ভাংচুর, বিশ্বযুদ্ধোত্তর শঙ্কা ও সংঘাতমুখর ব্যক্তিমানসের নিরন্তর দ্বন্দ্ব ও আত্ম-অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নির্মল পরিমণ্ডলের সন্ধান যেন তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যকর্মের অন্বিষ্ট । একজন সাহিত্যিকের শিল্পভাবনায় অবশ্যই বিজ্ঞাপিত হবে তাঁর সৃষ্ট পাত্র-পাত্রীদের জীবন-ভাষ্য। এটি সূচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য লেখকের প্রয়োজন গভীর অভিনিবেশ এবং সমাজ-চরিত্রের কালিক অভিজ্ঞান—যা শওকত আলীর শুধু পর্যাপ্ত নয়; বরং পরিপূর্ণ ছিল বলেই প্রতীয়মান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুসন্ধিত্সু শিক্ষার্থী হিসেবে এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে আজীবন তিনি সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন এবং প্রায় মগ্ন ছিলেন এসবের সারাত্সার হূদয়ঙ্গমে। তাই প্রাচীন বাংলা বা বঙ্গের ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, মিথ ও ধর্ম, দর্শন, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ছিল তাঁর প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য।
সময়ের চলমান বলয়ে সাধারণত আমরা ঘুরপাক খাই কিংবা খেতে ভালোবাসি। কিন্তু ভাবি না, সময়, সে তো আজকের নয়—অনাদি-অনন্ত উত্স হতে তার যাত্রা, অনিঃশেষ তার বহমানতা। আমরা তার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের পাত্র-পাত্রী মাত্র। সুতরাং আত্ম-অন্বেষণ ও অনুসন্ধান যদি প্রয়োজনীয় বিবেচনা করি, তবে ফিরে তাকাতেই হবে আমাদের দূর পশ্চাত্কালের সময়ের প্রেক্ষাপট এবং তার পাত্র-পাত্রীদের দিকে। অসাধারণ ধীশক্তি আর অতুলনীয় অনুসন্ধিত্সায় শওকত আলী প্রায় ৮০০ বছর আগেকার আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন-জীবিকা আর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহের অকাট্য দলিল রচনা করেছেন অনন্য শিল্পশৈলীতে। প্রদোষকালের মানুষদের প্রায় অনুদঘাটিত জীবন-আখ্যান শৈল্পিক সুষমায় তিনি বর্তমান সময়ে বহন করে এনেছেন—যা সমগ্র বাংলা সাহিত্যে প্রায় দুর্লভ। ঘটনাচক্রে এ মহত্ কাজটি যদি তাঁর দ্বারা সম্পন্ন না হতো তাহলে আমাদের রাঢ়, সমতট তথা বৃহত্তর বঙ্গের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের অন্তকরণের মৌলিক অনুঘটক এবং তার বৈশিষ্ট্য হয়তো অপরিজ্ঞাতই থেকে যেত। বিশাল এক শূন্যতা পূরণের অনুপম শিল্পিত ভাষ্য মহান এ লেখকের ধ্রুপদি উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর বৃহত্তর এ ব-দ্বীপের সাকুল্য ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা—এ নিরেট সত্য অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি ক্ষুদ্র যে প্রতিপক্ষ, তারাও উপর্যুক্ত বক্তব্যের সঙ্গে দ্বি-মত করবে মনে হয় না, কারণ তাদের মেরুদণ্ড বরাবর যে বাড়িটা পড়েছে, নিকট ইতিহাসে এ অভিজ্ঞতা হয়তো প্রথম। কিন্তু এ ঘটনা সমাজের অন্তঃপ্রবাহে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে তা শনাক্ত করে শিল্পে-সাহিত্যে যথাযথভাবে ধারণ করে জন-মানসের চাহিদা ও প্রাপ্তির নিগূঢ় হিসাবটি, বলা যায় সেভাবে আসেনি। এ ব্যত্যয় কিংবা উপেক্ষা বা উদাসীনতা একপ্রকার ভ্যাকুয়াম তৈরি করে রেখেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধের অব্যবহিত পরে নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ বা প্রকাশিত গল্প-উপন্যাসে ‘তাত্ক্ষণিকতা’ থাকবে—এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায় চার দশকেও উপরিতলের অস্বচ্ছ আচ্ছাদন সরিয়ে গভীরতর উপলব্ধিসঞ্জাত মানবিক আবেদন এবং যুদ্ধ ও আন্দোলনের কার্যকারণ উদ্ঘাটনসহ তাদের অন্তর্পাঠ সাহিত্যে যথাযথ ব্যঞ্জনায় পরিদৃষ্ট হবে না—বিষয়টি আমাদের কিঞ্চিত্ ব্যথিত করে।
এ প্রেক্ষিতে অমর কথাশিল্পী শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এক অনবদ্য সংযোজন। ভাবতে অবাক লাগে, মহান নেতা তাঁর ভাষণে কিন্তু মুক্তির কথাটিই আগে বলেছেন, স্বাধীনতা এসেছে পরে। অথচ মনে হয় সকল রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক শক্তিকেন্দ্র, সুশীল সমাজ সকলেই যেন ‘স্বাধীনতা’টাই মুখ্য করে তুলেছেন, ‘মুক্তি’ নয়—যা মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের আরাধ্য। ঠিক এখানটাতেই প্রদোষে প্রাকৃতজনের অনন্যতা। এ যেন অন্ত্যজজনের অন্তর্কথনের—তাদের প্রেম-দ্রোহ ভাব ও বিভাবের এবং সর্বোপরি জীবনের অবিরাম সন্মুখপ্রসারী গন্তব্যের পানে নিরন্তর অভিযাত্রার অকৃত্রিম আলেখ্য, ‘মুক্তি’প্রার্থী গণমানুষের আখ্যান।
বিস্তৃত প্রান্তর পেরিয়ে গুরু বসুদেব কর্তৃক বিতাড়িত শিল্পী শ্যামাঙ্গ যখন পুনর্ভবার তীর ধরে অজানা গন্তব্যে হেঁটে চলে তার সাথে এ দেশের গাছ-গাছালি, নদ-নদী, আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ, নীলাকাশে উড্ডীন বিহঙ্গ এককথায় প্রকৃতির সকল অনুষঙ্গ যেন সঙ্গী হয়। ইন্দ্রের সভায় নৃত্যরত বেহুলার সঙ্গে যেমন বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদে ওঠে তেমনি শ্যামাঙ্গকে যেন বরাভয় দান করে, তার অস্তিত্ব রক্ষায় যেন সক্রিয় হয়ে ওঠে বাংলার প্রকৃতি।
রেডক্লিফের কলম যেন ভারত বা কোনো দেশের মানচিত্র নয়; বরং ছুরি হয়ে মানুষের হূদয় চিরে দিয়েছে, অন্ত্যজ মানুষেরা এ রক্তাক্ত হূদয় নিয়ে ভিন্ন উপত্যকায় পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু শ্যামাঙ্গ-লীলাবতী’র এই গন্তব্যহীন যাত্রা শেষতক কোনো চূড়ান্ত ঠাঁই পায়নি। বরং ক্রমশ দেশ ও কালের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের দিশাহীন উন্মূল পথচলা ক্লান্তিহীন, সমাপ্তিহীন ছড়িয়ে পড়েছে, বিস্তারিত হয়েছে, সংক্রমিত হয়েছে সর্বত্র। জাতীয়তা, পরিচয় কিংবা প্রভুবদল অল্পে তৃপ্ত অতি সাধারণ এ মানুষদেরকে একটি নিরাপদ শ্যামল ভূ-ভাগ উপহার দিতে পারেনি। সেই ধাবমান পলায়নপর মানুষ, প্রদোষকাল থেকে ছুটে চলা মানুষদের আমরা সাতচল্লিশে দেখি (লেখক নিজেই ’৪৭-এর একজন উদ্বাস্তু), একাত্তরে দেখি, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিনে দেখি, আফ্রিকায় দেখি, আরাকান আর ভূ-মধ্যসাগর উপকূলসহ নানাদেশে দেখি। অনিঃশেষ এ মিছিলে শ্যামাঙ্গ, লীলাবতীদের চিনতে আমাদের বেগ পেতে হয় না। আবহমান বাংলার লোকায়ত এইসব চরিত্র বিশ্বমানবের এবং মানবতার প্রতিভূ হয়ে ওঠে। তাদের অতৃপ্তি, উন্মূল জীবন আমাদের সংস্থিত হতে দেয় না। বসন্ত দাসের সাথে অপেক্ষার পালা আমাদেরও শেষ হয় না। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণি তথা ব্রাত্যজনের অন্তর্ধ্বনি : ‘এই কি মানুষের জীবন? সুখ নেই, স্বস্তি নেই, গৃহ নেই, কেবলি প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে হচ্ছে— এর শেষ কোথায়? এ জীবন কি যাপন করা যায়? বলো কতোদিন এভাবে চলবে?’ জবাবহীন এ প্রশ্নের আবেদন বিদ্যমান রেখেই সমাপ্ত হয় প্রদোষকালের মানুষের অসামান্য লড়াইয়ের অনবদ্য দলিল ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’।
মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়ার ফলে তার সহজাত স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নভঙ্গ ও পুন বিনির্মাণের অন্তহীন সংগ্রাম এ গ্রন্থের প্রাকৃতজনের আলাপ-বিলাপে, ভাবে ও অভাবে, অনুরাগ-বিরাগে অবিশ্রাম বহমান থেকেছে ফল্গুধারার মতো। উজুবট গ্রাম, পুনর্ভবা আত্রাই-করতোয়ার উপকূল ধরে বেড়ে ওঠা সমাজ ও লোকালয় এক আশ্চর্য দ্যোতনায় পাঠকমনে ক্রিয়াশীল থাকে—গ্রন্থটির পাঠে কিংবা পাঠোত্তর কালে। চপলা তটিনীর মতো ধেয়ে চলা লীলাবতী, মায়াভরা মুখের মায়াবতী, শিল্পী শ্যামাঙ্গ কিংবা বসন্ত দাসের অনুক্ষণ মুক্তির পথের অনুসন্ধান পাঠককুলকে জীবনের অন্বিষ্ট সন্ধানে তাড়িত করে।
নর্তকী বিভা, সেবাদাসী কৃষ্ণা প্রত্যেকেরই নিজ ক্ষুদ্র পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জীবনের অপূর্ব আস্বাদ লাভের প্রচেষ্টা, তার জন্য প্রতীক্ষা এবং অবিশ্রাম লড়াই মানবতার ইতিহাসে তাদেরকে মহীয়ষী রমণীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। এমনকি যে ডোম রমণীর গোপনাঙ্গে উত্তপ্ত লৌহ শলাকা প্রবিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সেও যেন মহামুক্তি সংগ্রামের এক অকুতোভয় বীরাঙ্গনা। মানুষ, প্রকৃতি ও মানবতার মুক্তির প্রত্যেকটি উপাখ্যানে এ নির্যাতিত রমণী স্বীয় মহিমায় হাজির হয়। একাত্তরে আমরা এ ভূখণ্ডে তার দেখা পাই, দেখা পাই ধ্বসে পড়া বহুতল ভবনের নিচে নিথর দেহের সুতাকন্যাটির নিশ্চল চাহনিতে—সেই একই বিষয় ফিরে আসে বারবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে। কিন্তু তাতে মৌল চরিত্র পাল্টায় না—সহজেই তারা শনাক্ত হয়—‘নিরপরাধ হলেই তুমি রক্ষা পাবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ আমাদের দেয় না’—না সমাজ না রাষ্ট্র। তাই বিপন্ন মানবতার আর্তনাদ সুখ-স্বপ্ন বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় তাদের ধেয়ে চলা চলমান থাকে অবিরাম।
প্রদোষে প্রাকৃতজন একটি ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। ইতিহাসের ছায়া এতে আছে বটে, তবে তা জয়ীদের নয়, বরং অচ্ছুত, উন্মূল, হতচ্ছাড়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর—যারা জন্ম-জন্মান্তরে ঐতিহাসিকের দৃষ্টির বাইরে থাকে, প্রাসাদ তোরণের বহু দূরে থাকে অর্বাচীন-অপাঙেক্তয়। এই লুণ্ঠিত, নির্যাতিত, ব্রাত্য জনগণকে তিনি নিয়ে এসেছেন মানুষের পঙিক্ততে। লীলাবতী, শ্যামাঙ্গ, সেবাদাসী, কৃষ্ণা, বসন্ত দাস সকলেই যেন দাঁড়িয়ে যায় নিরন্তর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা সভ্যতার, মানবিক বোধ ও বুদ্ধির ক্রমবিকাশমান ধারায়—ইতিহাস যেন খানিকটা ঝাপসা হয়ে ওঠে। মৃিশল্পী শ্যামাঙ্গের ভাবনা—‘প্রজাকূল সুখী, ব্রাহ্মণ সুখী, কায়স্থ সুখী, বৈশ্য সুখী। কেবল ব্রাত্য শুদ্রদের গৃহে অন্ন নেই, দেহে বস্ত্র নেই, মস্তকোপরী গৃহের আচ্ছাদন থাকে না, তথাপি আজ যদি গ্রামপতি বসবাসের স্থান দিলেন তো কালই বলবেন, দূর হ পামরের দল’—যেন অন্তহীন-অনিঃশেষ। শ্যামাঙ্গের কাল পেরিয়ে দেশ নানাভাবে বিভক্ত হয়ে নবরূপে স্বাধীনতার আস্বাদ পেলেও প্রায় একই কথা এখনো সমভাবে আবেদনশীল।
আলো আর আঁধারের মাঝামাঝি সময়টি সাধারণভাবে প্রদোষকালের মধ্যে পড়ে। রাত শেষ হয় হয়, কিন্তু ভোরের আলো তখনো ফোটেনি—এই সময়টাকেই চিহ্নিত করি ‘প্রদোষ কাল’ বলে। বঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের সুকঠিন এক পালাবদলের সন্ধিক্ষণে ক্ষয়িষ্ণু সেন রাজত্বের শেষ অধ্যায়ে সামন্ত প্রভুদের নিপীড়নের মুখে প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব সংকট এবং এতদঞ্চলে মুসলিম আগমনের প্রেক্ষাপটে তত্কালীন জনজীবন, তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, বোধ-বুদ্ধি, আশ্রয়-প্রশ্রয়, আস্থা ও বিশ্বাসহীন উন্মূল জনগোষ্ঠীর আত্ম-আবিষ্কারের প্রয়াস এবং সামন্তদের দুঃশাসন ও উত্পীড়নের বিপরীতে অন্ত্যজজনের আর্তনাদ ও হাহাকার লেখক স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি ও অনুপম ভাষাশৈলীতে হূদয়-নিংড়ানো ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছেন। অনিশ্চিত ও অস্থির সেনরাজত্বের অবসান কাল, পলায়নপর ভিক্ষুদল, আসন্ন তুর্কি আক্রমণ—এমন সময়েও সামন্ত-মহাসামন্তদের নির্বিচার নিপীড়নের মুখে অসহায় অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই—এসবই আলোচ্য উপন্যাসকে একটি কিংবদন্তিতুল্য মাত্রায় অধিষ্ঠিত করেছে।
এমন যে লীলা—লীলাবতী, তার মুখোমুখি হলেই অভিভূত হয়ে যাই, হয়ে যেতে হয়। অমোঘ এক আকর্ষণ আমাদের অপূর্ব ‘লীলা’র জগতে হাতছানি দিয়ে ডাকে। দুর্নিবার টানে লীলাবতীর প্রেমে পড়ে যাই। মানুষ তার স্বপ্নের মাঝে বাঁচে, স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে, কখনো ধায় স্বপ্নের পিছে, কখনো বা স্বপ্নরা তাড়িয়ে বেড়ায় তার স্বাপ্নিককে। এভাবে গড়িয়ে যায় জীবনের আদ্যোপান্ত। স্বপ্ন থেকে স্বপ্নান্তরে লীলা’র বিবর্তন ও রূপান্তর আমাদের চমত্কৃত করে, বিমোহিত করে। লীলা’র জীবন এক অর্থে সামান্যই। অথচ জীবনের সকল পঙ্কিল বাঁক আর বাধা স্বচ্ছতোয়া জলধারার মতো চপলা এ মেয়েটি অসামান্য দৃঢ়তায়, ক্ষিপ্র গতিতে অতিক্রম করে যায়, অতিক্রম করে যায় জগতের সামান্যতাকে।
নতুন প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত রূপের সামন্তদের আগমন, অভিমন্যুদের মতো কীটসদৃশ মানুষের তাতে সঙ্গদান—এ সবই ইতিহাসের ক্রমাবর্তনিক ধারা। নির্যাতিত মানুষ তবু নবতর উদ্যমে মুক্তিপথ অন্বেষণ করে, প্রদোষ থেকে বেরিয়ে পেতে চায় আলোর দিশা। মানবতার মুক্তির এ ধারা অনিঃশেষ গন্তব্যে ধাবমান, যার হয়তো অন্ত নেই। প্রদোষের মানুষদের এ পথচলার যেন বিরাম নেই।