তপন শাহেদ
একটি জাতির দীর্ঘ ইতিহাস আর প্রাক্-ইতিহাসের বাঁক নেবার মুহূর্তগুলো একেকটা উজ্জ্বল তারার মতো তার জাতীয় জীবন আর সাহিত্যের আকাশে জ্বলজ্বল করে। বহুবন্দিত সেইসব মুহূর্ত হয়ে ওঠে ইতিহাসের একেকটি ল্যান্ডমার্ক, সাংস্কৃতিক প্রতীক। বৃহত্তর বাংলার যে অংশ আজ বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠিত এবং এখন দিনদিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে, তার ইতিহাসের সেই বাঁক নেবার প্রতিটি মুহূর্ত গৌরবময়। তাই কবিতায় কথাসাহিত্যে গদ্যে আলোচনায় বিতর্কে উদ্যাপনে সেইসব মুহূর্ত ফিরে ফিরে আসে। মার্চ তেমনই এক মুহূর্ত; দিনের সূর্যের মতো আকাশের আর-সব তারাকে অস্পষ্ট-বিলুপ্ত করে দিয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। বাংলাদেশের সবচেয়ে অগ্নিগর্ভ সময় যে-কবিপ্রজন্মের জন্মক্ষণ, তার অন্যতম এক প্রতিনিধি কামাল চৌধুরী সেই মার্চকেই তাঁর জাতির জন্মের ব্রাহ্মমুহূর্ত, কিংবা স্বয়ং প্রসূতি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু মার্চ কেন? কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ডিসেম্বর নয় কেন? কিংবা ফেব্রুয়ারি? কিংবা ইতিহাসের আরো অনেক উজানে—উনিশ শতক?
এ কথা অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নেই যে, বাঙালি হিসেবে আমাদের আজকের যে রূপ তার প্রায় সবটাই উনিশ শতকের দান। সেই অর্থে ‘আধুনিক’ বাঙালি—তা সে হিন্দু হোক বা মুসলিম, পশ্চিমবঙ্গীয় হোক বা পূর্ববঙ্গীয়—সবাই উনিশ শতকের সন্তান। আমাদের প্রতিবাদী নৃতাত্ত্বিক মনোভূমি সত্ত্বেও, বারো ভূঁইয়ার স্বাধীনচেতা দুর্মর সাহস আর সুফি-বাউলের উদার মানবিক জীবনদৃষ্টির সুদীর্ঘ ঐতিহ্য সত্ত্বেও, হিন্দু-মুসলিমের শান্তিপূর্ণ সহনশীলতা আর সম্প্রীতির আখ্যান সত্ত্বেও এ কথা কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না যে, ১৯৭১ সালে যে-আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের আবাসরূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার ভিত্তি উনিশ শতকের রাজনৈতিক শিক্ষা ও অভিঘাত। যে শিক্ষা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিয়েছিল, সেই একই শিক্ষা শেখ মুজিবুর রহমান নামে একই সাথে সংগ্রামী ও সহনশীল, বিশালহূদয় ও অসমসাহসী, উদার ও আধুনিক বাঙালি-মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিভার আবির্ভাবকে সম্ভব করে তুলেছিল।
এই মুজিবই তো এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে বাঙ্ময় করে তুললেন বাহান্ন থেকে একাত্তরের সুদীর্ঘ সংগ্রামে, তাকে চূড়ান্ত ঘোষণায় মূর্ত করে তুললেন মার্চে। সমস্ত পূর্ববঙ্গের মানুষ সেদিন শুধু এই একটি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে একত্র হয়েছিল, চূড়ান্ত যুদ্ধের দীক্ষা আর আহ্বান নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল শত শত রণাঙ্গনে। এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনে এমন অগ্নিগর্ভ রক্তাক্ত জন্মক্ষণ আর আসেনি।
প্রসূতি মার্চ হোক বা ফেব্রুয়ারি, কিংবা উনিশ শতক, ডিসেম্বর হলো তার সন্তান—সমাপ্তি। কিন্তু এ কথা সত্যি যে ফেব্রুয়ারিতে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি, আর সেই প্রথম রক্তস্নাত প্রতিবাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রথম স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছি যে বাংলা ভাষাভাষী জাতি হিসেবে আমাদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি চাই—ভাষিক-সাংস্কৃতিক অর্থে তো বটেই, ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক অর্থেও। অর্থাত্, স্বাধীনতা। কিন্তু ফ্রেব্রুয়ারিতে তখনো আমরা সেই স্বাধীনতা চাইনি—জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম পরিপূর্ণ স্বাধীনতা চাওয়ার মতো পরিপূর্ণতা তখনো পায়নি বলে হয়তো। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল মার্চে।
বাঙালির মুক্তির মহত্তম কবিতা লেখা হলো মার্চ মাসে—১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে। ‘রাজনীতির কবি’র রচিত সেই কবিতার মতো এমন বিশ্বনন্দিত, জননন্দিত গণকবিতা আর নেই। সেই কবিতার প্রেরণায় দীপ্ত এই মার্চেই আমাদের রক্তাক্ত জন্মযুদ্ধের সূচনা। সুতরাং, ‘আমরা সবাই মার্চের সন্তান’—এই সত্যই ঐতিহাসিক, আর বাংলাদেশের সত্তরের দশকের এক অন্যতম প্রধান কবির এই কাব্যবিবৃতি তাঁর ইতিহাসবোধের ছন্দোময় প্রকাশ।
কামাল চৌধুরীর কাব্যসাধনার শুরু থেকেই তাঁর কবিতায় দেশের ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রাম, জাতির জনক, দেশের মানুষ আর তার প্রকৃতি একটি কেন্দ্রীয় স্থান নিয়েছে। তাঁর ‘উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘মার্চ’ কবিতাটি তারই একটি নিদর্শন।
‘মার্চ’ কবিতাটির অনন্যতা এর গঠনসৌষ্ঠবে, সংহতিতে এবং প্রকাশভঙ্গির নিজস্বতায়। নিটোল ষড়মাত্রিক মাত্রাবৃত্তে রচিত এই কবিতা এর সমধর্মী অন্যান্য কবিতা থেকেও সুস্পষ্টভাবে আলাদা।
মোট আটটি অনুচ্ছেদে সাজানো হয়েছে কবিতাটি, প্রতিটি অনুচ্ছেদে আছে চারটি করে পঙিক্ত। মিলবিন্যাসে রক্ষিত হয়েছে সুনির্দিষ্ট কাঠামো—দ্বিতীয় এবং চতুর্থ পঙিক্ততে অন্ত্যমিল। এই কবিতার অন্ত্যমিলগুলো স্বাভাবিক, নিপুণ এবং অবিকল্প। পয়ারে লেখা না হলেও বাংলা কবিতার বহু শতাব্দীর অন্ত্যমিলের প্রতিধ্বনি শোনা যায় এই কবিতার প্রতিটি মিলের অপরিহার্য অথচ সরল আবির্ভাবে। যেমন—
মার্চ এসে গেছে প্রতিরোধী লাঠি হাতে
সবুজে ও লালে মানচিত্রের রোদে
দুহাতে নতুন প্রাণের পতাকা নিয়ে
মার্চ এসে গেছে কোটি মানুষের ক্রোধে।
প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ পঙিক্ত বা বাক্যটিতেই এই ঐতিহ্যিক সারল্যের বাগভঙ্গি চেনা যায়—
মার্চ এসে গেছে বাংলার ঘরে ঘরে।
বাংলার ঘরে ঘরে মার্চ এসে যাওয়ার এই বারতা যেন বাংলার প্রকৃতিতে শীত বা অঘ্রান কিংবা বসন্ত আসার খবরের মতো, বাংলার প্রাত্যহিকতায় হালখাতা বা নবান্ন আসবার সুসংবাদের মতোই আমাদের বাঙালি মনকে উদ্বেল করে। এভাবে মার্চের আগমনী শুনিয়ে যে কবিতার সূচনা হয়, ক্রমে ক্রমে নদীর স্রোত, নৌকোজীবন, সাম্পান, চিরদিনের চেনা কিন্তু সংগীতের মতো মধুর নদীনাম, মাছভাত, সবুজ-লাল মানচিত্র—এইসব মোটিফের উল্লেখে সে কবিতা চিরায়ত শিল্পের রূপ নেয় অচিরেই। আর তার পরেই ‘কোটি মানুষের ক্রোধ’, জয়বাংলা, শেখ মুজিবের ‘সাহসের তর্জনী’, ‘পাকি হানাদারের’ গণহত্যার ইতিহাস শোনা যায়। চিরায়ত জীবনের শ্যামলিমায় মেশে ইতিহাসের রক্তস্রোত, মানুষের হিংস্রতা আর পশুত্বের বিরুদ্ধে মানুষেরই সংগ্রাম আর সাহসের অগ্নিভ ইতিবৃত্ত মূক কিন্তু বাঙ্ময় চলচ্চিত্রের মতো পাঠকের দৃষ্টির সামনে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যেতে থাকে।
‘মার্চ’ কবিতাটির শিল্পনির্মিতির মূল উপাদান চিত্রকল্প। কবিতাটির একেকটি চিত্রকল্প যেন কোনো সুনির্মিত চলচ্চিত্রের একেকটি ফ্রেম, একেকটি অনুচ্ছেদ একেকটি সুগঠিত শট। এখানে মার্চ বছরের একটি বিশেষ মাসমাত্র নয়, নয় কেবলই একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ মুহূর্ত। মার্চ নিজেই একটি সত্তা, একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক আধার যা ধারণ করে আছে একটি জাতির অস্তিত্বের সমস্ত পূর্বাপর উপাদান ও মুহূর্তকে। একটি নদীর মতো, বা কোনো চলচ্চিত্রের মতো এই উপাদানগুলো এবং মুহূর্তগুলো প্রবহমান; নিছকই স্থির এবং অতীত কোনো ঐতিহাসিক সময় নয়। মার্চ একটি মহাকাব্যিক আখ্যানের উত্সমুখ, এমন একটি জাতির জন্মের ব্রাহ্মমুহূর্ত যে জাতির সম্ভাবনা অন্তহীন, শক্তি অপরিমেয়, যে জাতি বারবার ধ্বংসের ভস্মস্তূপ থেকে ফিনিক্সের মতো জেগে জেগে উঠে তার বিপুল পাখা মেলে দেয় প্রাণপৃথিবীর বিস্তারিত নীলাকাশে।
এই কবিতার চিত্রকল্প ও বিবৃতিগুলোর সংহতি বিস্ময়কর। সরল ও স্বল্পবাক কিন্তু ব্যঞ্জনার বারুদে ঠাসা এইসব চিত্রকল্প ও বিবৃতি : ‘মার্চের ভাষা সাহসের তর্জনী’, ‘মুজিব নামের রাখাল রাজার ডাকে’, ‘আমরা সবাই মার্চের সন্তান’। এই বিবৃতিগুলো কালোত্তীর্ণ স্লোগানের মতো। কেননা শুধু গঠনগত সুমিতি আর ছন্দসৌকর্যই শুধু নয়, এই বিবৃতিগুলোর উপরিকাঠামোর আড়ালে লুকিয়ে আছে ইতিহাস এবং লোকায়ত মোটিফ-প্রতীক-বিশ্বাসের গভীরতল। ‘সাহসের তর্জনী’ ৭ই মার্চে রেসকোর্সে মুজিবের উত্থিত তর্জনীর ব্যঞ্জনাবাহী। ‘রাখাল রাজা’ প্রতীকটির ব্যঞ্জনা আরো গভীর বা সুদূরপ্রসারী, কেননা শেখ মুজিব সেই সময়ের পাকিস্তানি অভিজাততন্ত্রের রাজনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে গণমানুষের সত্যিকারের প্রাণের রাজা হয়ে উঠেছিলেন। আর বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে নিজেকে ‘মার্চের সন্তান’-রূপে দেখার মধ্যে আছে প্রশ্নহীন ঐতিহাসিক সত্য ও বাস্তবতা। আর এসবেরই ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক-নৃতাত্ত্বিক অনুষঙ্গ সাথে নিয়ে গানের ধুয়ার মতো ফিরে ফিরে আসে মার্চের আগমনী সংবাদ—‘মার্চ এসে গেছে...’।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক-নৃতাত্ত্বিক অনুষঙ্গ কামাল চৌধুরীর কবিতার একটি নিজস্ব চারিত্র্য গঠনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে কবির বিভিন্ন কবিতা থেকে এ-সংক্রান্ত কিছু নিদর্শন তুলে ধরা যাক—
ক. এই দেশে আমি আছি রক্তভেজা এই জনপদে
সহস্র মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়ে যায়
তবু আমি ভয়হীন দীপ্র-বর্ণ অনার্য যুবক
[‘রক্তাক্ত পংক্তিমালা’, মিছিলের সমান বয়সী]
খ. বাংলা ভাষা পাখিদের, বাংলা ভাষা বৃক্ষ-জাতিময়
সবুজ পুস্তিকা ছাড়া মহাকালে কেউ কবি নয়।
[‘বৃক্ষ’, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল]
গ. এই কি আমার নদী—জন্মে জন্মে বাঁক নিতে নিতে
অনার্য জাতির রক্তে লিখে রাখে দেশাত্মবোধন।
[‘কবিতাংশ’, রোদ বৃষ্টি অন্ত্যমিল ]
ঘ. একটি ব-দ্বীপে এসে তেরোশ নদীর বুকে মিশে যায় সেই স্রোতধারা
[‘শামসুর রাহমান স্মরণে’]
ঙ. আমরা বদ্বীপের লোক
আমরা ভাত ও মাছের স্বপ্নে বেঁচে থাকি
[‘বিজয় দিবস’, উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা]
আমাদের অনার্য আদিকাল, নদী, ব-দ্বীপ, মাছ-ভাত—এইসব তথ্য ও মোটিফ কামাল চৌধুরীর কবিতায় পুনরাবৃত্ত যন্ত্রসংগীতের মতো বেজে চলে এবং এভাবে বয়ন করে নকশিকাঁথার মতো এক পটভূমি যার সম্মুখে ইতিহাসের মঞ্চে অভিনীত হয়ে চলে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় পালা, যার ফল—
আমারও প্রস্তুতি আজ একখণ্ড নদী রাষ্ট্রে
অক্ষরের অপূর্ব উত্থান।
[‘উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা’, উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা]
পরবর্তী উদ্ধৃতিদুটি তো একেবারে প্রত্যক্ষ ‘অ্যাকাডেমিক’ আত্মানুসন্ধানের তথ্য তুলে ধরছে—
আমাদের দাবি—আমাদের গায়ে লেগে আছে অনার্য রোদ্দুর
পুরোনো পাথরের স্তূপ দেখে আমরা শনাক্ত করতে পারি প্রার্থনার গৃহ
অথচ অসংখ্য নদী, সমুদ্র সমতল, আমাদের মাছ-ভাতের ঐতিহ্য
সবটাই ধীবরকালের নৃতত্ত্ব।
[‘ধীবরকালের নৃতত্ত্ব’, পান্থশালার ঘোড়া]
কোথাও প্লাবিত ব-দ্বীপে আমাদের
অস্থির খননকর্ম, মাটি সন্ধান.....
[‘স্বপ্ন’, উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা]
‘মার্চ’ কবিতাতেও এই উপাদানের নির্ভুল ও অপরিহার্য উপস্থিতি রয়েছে—
আমার ঠিকানা নদ-নদীদের দেশে
পিতৃপুরুষ বাঙালি মাছে ও ভাতে
তবুও আমার শ্যামল শরীর রাগী...
কামাল চৌধুরীর কবিতার, বিশেষত তাঁর স্বদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতার অন্তর্নিহিত বহুমাত্রিকতা অনেক ক্ষেত্রেই এই ভূ-নৃতাত্ত্বিক আত্মসচেতনতার গভীরতার মধ্যে নিহিত। এই উপাদান বা বৈশিষ্ট্যের পরিকল্পিত এবং পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি একই ধরনের অন্যান্য বাংলা কবিতায় পাওয়া যায় না, বাংলাদেশের অন্যান্য কবির কবিতাতেও এই বৈশিষ্ট্য এমন কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পায়নি। অনুমিতভাবেই, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিষয়ে কামাল চৌধুরীর প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন ও আগ্রহ এই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় রসায়নের উত্সস্থল হিসেবে কাজ করেছে।
‘মার্চ’ কবিতাটির নিটোল সহজ গতিতে, ছন্দে, মিলে আর এই দেশের মৃত্তিকা আর ইতিহাসের সঙ্গে সংলগ্নতায় এর প্রতিটি পঙিক্ত যেন একেকটি কালোত্তীর্ণ স্লোগান হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে ‘মার্চের সন্তান’-রূপে দেখার মধ্যে যে ইতিহাসবোধ নিহিত তা কামাল চৌধুরীর সমস্ত কাব্যসাধনারই একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। বস্তুত ইতিহাসবোধে প্রোথিত না হলে যে-কোনো বিশ্বদৃষ্টিই খণ্ডিত ও অগভীর হতে বাধ্য। ‘মার্চ’ কবিতাটির আপাত-সরল কিন্তু প্রকৃত অর্থে বহুস্তর ভাবসম্পদের মধ্যে, এর শিল্পগত সুমিতি ও নিখুঁত নির্মাণকলার মধ্যে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের যে-চিরকালীন মহিমা আছে, শিক্ষিত কাব্যপাঠকের সাথে সাথে সাধারণ কাব্যনুরাগীরও তা চিনে নিতে কষ্ট হবার কথা নয়।