ফ য় জু ল আ ল আ মী ন
সম্প্রতি না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রখ্যাত ও শক্তিমান অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও খ্যাতিমান। সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করে লেখক হিসেবে সুনাম অর্জন শেষে অভিনয়ে থিতু হন এটিএম শামসুজ্জামান। তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পান চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর পাঁচ মাস ১০ দিন। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দেশের সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তার পূর্ণাঙ্গ নাম আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান হলেও ‘এটিএম শামসুজ্জামান’ হিসেবেই অধিক পরিচিত। তিনি ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনের শুরুতে পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে। পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিল আরেক অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে। তারপর জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। তার বাবা নূরুজ্জামান ছিলেন নামকরা উকিল এবং রাজনীতিবিদ। মা নুরুন্নেসা বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শামসুজ্জামান ছিলেন সবার বড়। ব্যক্তি জীবনে তিনি ধার্মিক ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি ১১ বার হজ করেছেন।
১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, সুভাষ দত্তের মতো বিখ্যাত পরিচালকদের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথম কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছেন জলছবি (১৯৭১) চলচ্চিত্রের জন্য। ২০০৯ সালে তিনি ‘এবাদত’ নামের প্রথম সিনেমা পরিচালনা করেন।
১৯৬৫ সাল থেকে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। সে সময় তিনি বেশ কয়েকটি সিনেমায় কৌতুকাভিনেতার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এই চরিত্রে তার অভিনীত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে- জলছবি, যাদুর বাঁশি, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা ইত্যাদি। খলচরিত্রে প্রথম সিনেমা ‘নয়নমণি’।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে— আলফা (২০১৯), দুই বেয়াইয়ের কীর্তি (২০১৫), দুটি মনের পাগলামী (২০১৪), পাগল তোর জন্য রে (২০১৩), আত্মগোপন (২০১২), চোরাবালি (২০১২), লাল টিপ (২০১২), জিদ্দি বউ (২০১২), মায়ের জন্য পাগল (২০১১), গেরিলা (২০১১)। যেমন জামাই তেমন বউ (২০১০), আমার স্বপ্ন (২০১০), চেহারা (২০১০), ওপারে আকাশ (২০০৯), রিটার্ণ টিকিট (২০০৯), পৃথিবী টাকার গোলাম (২০০৯), এবাদত (২০০৯), বাংলার বউ (২০০৭), ডাক্তার বাড়ী (২০০৭), সাথী তুমি কার (২০০৬), ভালোবাসা ভালোবাসা (২০০৬), মোল্লা বাড়ীর বউ (২০০৫), হাজার বছর ধরে (২০০৫), শাস্তি (২০০৪), আধিয়ার (২০০৩), ওদের ধর (২০০২), শ্বশুরবাড়ী জিন্দাবাদ (২০০১), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭), ঘৃণা (১৯৯৪), ত্যাগ (১৯৯৩), চাকর (১৯৯২), ন্যায় যুদ্ধ (১৯৯১), চাঁপা ডাঙ্গার বউ (১৯৮৬), পরিণীতা (১৯৮৬), আশার আলো (১৯৮২), ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), অশিক্ষিত (১৯৭৮), নয়ন মনি (১৯৭৬), চোখের জলে (১৯৭৪), সংগ্রাম (১৯৭৪), স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা (১৯৭৩), শ্লোগান (১৯৭৩), অবুঝ মন (১৯৭২), ওরা ১১ জন (১৯৭২), বড় বউ (১৯৭০), মলুয়া (১৯৬৯), সুয়োরাণী দুয়োরাণী (১৯৬৮)।
দীর্ঘ ৬০ বছরের অভিনয় জীবনে ছয়বার জিতেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৮৭ সালে ‘দায়ী কে?’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে। এরপর দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কারটি লাভ করেন ১৯৯৯ সালে শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘ম্যাডাম ফুলি’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা বিভাগে। একই ক্যাটাগরিতে ২০০৩ ও ২০১০ সালে আরও দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেতা বিভাগে ‘চোরাবালি’ ছবির জন্য লাভ করেন পাঁচ নম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০১৯ সালে লাভ করেন একুশে পদক ও ঢাকা মডেল এজেন্সি অ্যাওয়ার্ড থেকে আজীবন সম্মাননা। ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। একই বছর এটিএমের হাতে ওঠে প্রয়াত অভিনেতা বুলবুল আহমেদ স্মৃতি সম্মাননা পদক।