পৃথিবীর ২৮০ কোটি মানুষ প্রতি মাসে ফেসবুক ব্যবহার করেন। মানুষের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় ফেসবুক হইল এই পৃথিবীর সবচাইতে বড় প্ল্যাটফরম। সদস্যসংখ্যা ও জনপ্রিয়তার শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রাইভেট সংস্থাটির ক্ষমতাও বিপুল। সেই ক্ষমতার পরিধি এতটাই ব্যাপক যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও কিছুদিন পূর্বে ব্লক করিয়া দিয়াছিল ফেসবুক। মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার কিংবা বাক্স্বাধীনতাকেও ফেসবুক প্রতিনিয়তই হস্তক্ষেপ করিয়া থাকে। তবে মানুষের সহিত যাহা চলে তাহা তো আর রাষ্ট্রের সহিত চালানো সম্ভব নহে। রাষ্ট্রের সহিত গোঁয়ার্তুমি করিবার সবচাইতে বড় ধাক্কা ফেসবুক খাইয়াছিল চীনের নিকট হইতে। চীনে এখনো ফেসবুক বন্ধ। সম্প্রতি ফেসবুকের সহিত অস্ট্রেলিয়ার ঝামেলার দিকে সমগ্র বিশ্বই বিশেষ নজর রাখিয়াছিল। কারণ, যেই ইস্যুটি লইয়া ঝামেলা সৃষ্টি হয়, তাহা কেবল অস্ট্রেলিয়ার নহে, সমগ্র বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। তবে আপাতত অস্ট্রেলিয়া সেই দিকে শক্ত পদক্ষেপ লইয়াছিল।
সমস্যাটির গোড়ায় দৃষ্টি দেওয়া যাউক। বিষয়টি হইল সংবাদমাধ্যমগুলি ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করিয়া পাঠকের নিকট তাহাদের সংবাদ পৌঁছাইয়া দেওয়ার কাজ করিয়া থাকে। ইহা সমগ্র বিশ্বেরই সংবাদমাধ্যমের সাধারণ ব্যবস্থা। কারণ ইহাতে সংবাদমাধ্যমগুলির রিচ অর্থাত্ হিট অনেকখানি বাড়িয়া যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাও প্রয়োজনীয় খবরগুলি শেয়ার করিয়া থাকেন তাহাদের প্রোফাইলে। লক্ষ লক্ষ মানুষের টাইমলাইনে ভাসিয়া উঠে শিরোনাম। আর এইভাবেই কোনো খবর ভাইরাল হইয়া পড়ে। ইহাতে লাভ উভয়পক্ষেরই। অর্থাত্ সংবাদমাধ্যম তাহার রিচ বৃদ্ধি করিতে পারে, আবার এই সকল খবর ফেসবুকের টাইমলাইনে পড়া যায় বলে ফেসবুকেরও কিছুটা রিচ বাড়ে। এই কারণে ডিজিটাল মিডিয়ার এই যুগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলি সংবাদমাধ্যমের অনেক বড় হাতিয়ার। এই কারণে বিশ্বের অনেক সংবাদমাধ্যম সরাসরি ফেসবুকের সহিত চুক্তি করিয়া থাকে, যাহাতে ইনস্ট্যান্ট আর্টিকেলের মাধ্যমে দ্রুত তাহাদের খবর পৌঁছাইয়া যায় পাঠকের নিকট। এই ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার একাধিক সংবাদমাধ্যম দাবি করিয়াছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে তাহাদের পেজে ৭-৯ শতাংশ বাড়তি ট্রাফিক আসিয়া থাকে। ফলে উহা হইতে ফেসবুকেরও আয় বাড়িয়া থাকে; কিন্তু ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে লাভের সামান্য একটা অংশ সংবাদমাধ্যমের হাতে আসে। এই নিয়ম বিশ্ব জুড়িয়াই মানিয়া চলা হইতেছে। তবে এই আয় কিন্তু স্থায়ী নহে। পাঠকের সংখ্যা বাড়িলে, তবেই বিভিন্ন সংস্থার তরফ হইতে বিজ্ঞাপন মিলিয়া থাকে। দেখা যাইতেছে এই ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুক উভয়েই উভয়ের স্বার্থ দেখিয়া আসিতেছিল; কিন্তু অস্ট্রেলিয়া নূতন আইন প্রবর্তন করিয়া বলিয়া দেয় যে, গুগল, ফেসবুকের মতো সংস্থাগুলিকে খবরের লিংক শেয়ার করিতে হইলে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমকে অর্থ দিতে হইবে। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল—গুগল শর্তটি মানিয়া লয়; কিন্তু বাধ সাধে ফেসবুক। গত সপ্তাহে ফেসবুক অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রকাশনা সংস্থা ও অস্ট্রেলীয় গ্রাহকরা আপাতত ফেসবুকে কোনো খবরের লিংক শেয়ার করিতে পারিতেছিল না। ফেসবুক উহা আটকাইয়া দেয়। ফেসবুক স্পষ্ট করিয়া জানাইয়া দেয়, অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া-সংক্রান্ত নূতন প্রস্তাবিত আইনের জবাবে ফেসবুক ঐরকম কড়া সিদ্ধান্ত লইয়াছে। ইহার পর আমরা দেখিতে পাই অস্ট্রেলিয়া ও ফেসবুকের শীতলযুদ্ধ। খোদ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ফেসবুকের বিরুদ্ধে। তবে গত মঙ্গলবার শেষাবধি রণে ভঙ্গ দেয় ফেসবুক। ইহার সহিত অস্ট্রেলিয়াও তাহাদের এই সংক্রান্ত নূতন আইনে কিছুটা সংশোধনী আনিয়াছে।
প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের শক্তি যতই বেশি হউক, রাষ্ট্রের শক্তির সহিত তাহা কখনোই কুলাইয়া উঠিতে পারে না। তবে ফেসবুক নিজেও চাহে না কোনো রাষ্ট্রের সহিত বিবাদে জড়াইতে। বরং রাষ্ট্রের সহিত সমঝোতা করিয়া ব্যবসা বৃদ্ধি করাটাই উহার লক্ষ্য। সুতরাং ফেসবুক আর দশটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন আর কিছু নহে, যে শেষাবধি তাহার লাভের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়া থাকে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হইতেছে, বিশ্বে এখন মুনাফাই শেষ কথা।