আবার হোক ভাষা বিপ্লব!

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আন্দোলনের  সাত দশক পরেও প্রণীত হয়নি রাষ্ট্রীয় কোনো ভাষানীতি। ১৯৮৭ তে সর্বস্তরে  বাংলা ব্যবহারের যেই রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গৃহীত হয়েছিল, অনুকূল পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। বলা যায়, জনসাধারণের অনাগ্রহের দরুন বিষয়টি পাত্তা পায়নি। কতিপয় কিছু সরকারি দপ্তর ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে ইংরেজিই রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে বসেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢালাওভাবে চালু হয়েছে ইংরেজির প্রচলন। আজকের বঙ্গদেশে অভিজাত সব রেস্তোরাঁ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতানের নামকরণ হচ্ছে ইংরেজিতে, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডগুলোতেও চলছে ইংরেজির ছড়াছড়ি। ১৯৮৪ সালের এক নির্বাহী আদেশে সকলপ্রকার সাইনবোর্ড বাংলায় লেখার কথা বলা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। টেলিভিশনের খবর পাঠক থেকে শুরু করে উপস্থাপকেরা বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলেন। নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, টকশো, সভা-সেমিনারে আজকাল ব্যবহূত হচ্ছে বাংলা-ইংরেজির সংমিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত এক ‘বাংলিশ’ ভাষা। বিকৃত এই ‘বাংলিশ’এর ব্যারাম দুঃখজনকভাবে সংক্রমিত হচ্ছে দেশের জনসাধারণের মধ্যে।

নানান ধরনের আঞ্চলিক ভাষা বাংলায় এনে দিয়েছে নতুন এক বৈচিত্র্য। আঞ্চলিকতা দূষণীয় নয়, কিন্তু আজকাল আঞ্চলিক ভাষায়ও ঘটছে বিকৃতি। অতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় আঞ্চলিক ভাষাগুলো হারাচ্ছে স্বকীয়তা। একাধিক ভাষার মিশ্র প্রয়োগের ফলে সেগুলো না হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা, না থাকছে শুদ্ধ-স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে ভাষা বিকৃতির নজির সবচেয়ে বেশি মিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই বাংলা লিখেন রোমান হরফে। এভাবে বাংলা লেখায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার সৌন্দর্য, প্রতিনিয়ত উদ্ভব হচ্ছে  অদ্ভুত কিছু শব্দের। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নতুন প্রজন্ম এই জগাখিচুড়ি মার্কা ভাষা ব্যবহার এমনকি ইংরেজি ধাঁচে বাংলা উচ্চারণের নাম দিয়েছে আধুনিকতা। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া একমাত্র জাতির দ্বারা ভাষার এই অপমান বড় লজ্জার, বড় দুঃখের। মাতৃভাষার প্রতি এই ঔদাসিন্য ক্রমশ  আত্মসাত্ করে নিচ্ছে  বাংলার গৌরব, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে।

ইংরেজির ব্যবহার সীমাবদ্ধকরণে স্বউদ্যোগে বাংলা প্রচলনের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন বৃদ্ধিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও টিভি চ্যানেলগুলোকে সরকারি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। বিদেশি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার সীমাবদ্ধ করতে হবে। চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ড প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে এই বিষয়গুলোকে সরকারি নজরদারির আওতাভুক্ত করা আবশ্যক। বাংলার উত্কর্ষসাধন ও প্রয়োজনীয় চর্চার ব্যবস্থাকরণে দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুস্পষ্ট নীতিমালা। বাংলার শুদ্ধরূপ সহজভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসতে হবে দেশের সর্বস্তরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে, সংস্কৃতিকর্মীদের হতে হবে আরো বেশি ভাষাসচেতন। নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের ভাষা ব্যবহার ও শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

ভাষার লজ্জাজনক বিকৃতি শক্তহাতে দমন না করলে অচিরেই অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হবে প্রাণের বাংলাকে। ভাষার এই সমকালীন সংকট দূরীকরণে দরকার সামাজিক আন্দোলন, বাংলার গৌরব পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনে আবার হোক ভাষা বিপ্লব। প্রাণপ্রিয় ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা, সমৃদ্ধকরণ ও শুদ্ধপ্রচলন সম্ভব হলে তবেই অর্জিত হবে ভাষাশহিদদের সার্থকতা; সার্থক হবে একুশের চেতনা। ভাষার মাসে ভাষা রক্ষাই হোক সবার অঙ্গীকার।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ