অদেখা জীবনের গল্প

তার বাবা ছিলেন এমন, নিঃশর্তে কোনো প্রতিদানের আশা না রেখেই সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই জাতির জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। জীবনের ১২-১৩ বছর জেলেই কেটে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর, কারণ স্রেফ একটাই। সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বঙ্গবন্ধু সেই কারণটা বলেছিলেন My strength is I love my people, my weakness is I love them too much। শেখ হাসিনাও বাবার মতো দেশের মানুষের টান, তাদের প্রতি এক প্রকার দায়বদ্ধতা থেকে কখনোই বের হতে পারেননি। আর তাই সেই রক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষটা ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে!

সেই দিনটি ছিল রবিবার, বৃষ্টিস্নাত একদিন। প্রায় ১৫ লক্ষ জনতা সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। দেশের মাটিতে নেমে কান্নায় ভেঙে পড়েন শেখ হাসিনা। তিনি দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে বলেন, ‘যেদিন আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম সেদিন আমার সবাই ছিল। আমার মা-বাবা, আমার ভাইয়েরা, ছোট্ট রাসেল সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিল। আজকে আমি যখন ফিরে এসেছি, হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন, স্বাগত জানাতে এসেছেন, কিন্তু আমার সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চিরতরে চলে গেছেন।’

দীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর মানুষটা দেশে ফিরেছিলেন, পরিবারের সবগুলো আপনজনকে হারানোর সময় দেশবাসীর নির্লিপ্ততার যে ব্যথা, তার ওপর এই অজস্র মানুষের শুভেচ্ছায় একটু হলেও প্রলেপ পড়েছিল। পিতা নেই, কিন্তু পাহাড় সমান পিতার স্বপ্ন কিভাবে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন বছরের পর বছর। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে এতগুলো দিন সেই ভীষণ কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তার সেই কষ্টকে হার মানানোর, প্রতিকূলতার কাছে দমে না যাওয়ার একটা গল্প আছে। আছে প্রধানমন্ত্রীর বাইরে একজন সাধারণ শেখ হাসিনার গল্পও। তার সেই জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করা হয়েছে ‘হাসিনা; অ্যা ডটারস টেল’ ডকুফিল্মের মাধ্যমে। প্রায় ৫ বছর সময় লেগেছে এটি নির্মাণ করতে। নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন রেজাউর রহমান খান পিপলু।

আমি তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখাতে চেয়েছি

রেজাউর রহমান খান তার কথার শুরুতেই বলেন, ‘শেখ হাসিনা সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। আর সেকারণেই তার জীবনের প্রতিটি আলোচনায় রাজনীতির কথা এসেছে। কিন্তু আমি তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখাতে চেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি গণভবনে থাকা প্রতিটি গাছের নাম তিনি বলতে পারবেন। শুধু গাছের নাম জানাই নয়, আতিথেয়তায়ও জুরি নেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া থেকে প্রতিবছর বড়ই আসে ঢাকায়। মূল উদ্দেশ্য বড়ইয়ের আচার করা। সময় পেলেই আচার বানান তিনি। আর অতিথি এলে সেই আচার না খেয়ে যেতেই পারে না।’

এই ডকুমেন্টারি নির্মাণের শুরুতে কোনো পরিকল্পনাই ছিল না পিপলু খানের। তিনি বলেন, ‘আমাদের জার্নিটা শুরু হয় ২০১৩ সালে। বলা যায়, কোনো প্ল্যানিং ছাড়াই আমি কাজ করতে বসি। আমি ভাবি, বঙ্গবন্ধুর কন্যার সঙ্গে একটা সুযোগ, দেখি না কী হয়। ছবিটা আমাকে অনেক বদলে দিয়েছে। এই ছবিটা বানানোর উদ্দেশ্য দেশের নাগরিক হিসেবে এ দেশের একটি বড় ইতিহাসের অংশ ধরার চেষ্টা। আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু বানাইনি, আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যার গল্প তুলে ধরেছি। আমি পুরো ডকুমেন্টারিটা বানানোর সময় প্রধানমন্ত্রীকে আপা বলে ডাকি। আমি যেদিন প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই কাজ নিয়ে কথা বলতে বসি, আমি তাকে বলেছি যে, আমি ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ বলে কাজ করতে পারবো না, আমি আপনাকে ‘আপা’ বলবো। কারণ তাকে নিয়ে কাজ করতে গেলে আমাকে তার কাছে যেতে হবে।’

 

কেউ একজন হোঁচট খেলে উনি...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে গেলে একটা আলাদা অনুভূতি থাকবে, সেটা কী আর বলতে হয়! ওনার জীবনে এত এত ওঠানামা আছে, সেগুলো জানার পর গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। উনি খুব সহজেই সবকিছু নিতে পারেন। উনি প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে উনি আমার মা বা বড় বোন। কাজের সময় উনি প্রটোকল নিয়ে ভাবতেন না। যেমন উনি হাঁটছেন, ক্যামেরাম্যান ওনাকে ফলো করছেন। উনি সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন, আগেই বলেন, এই তোমরা সিঁড়ি দেখে ওঠো। কেউ একজন হোঁচট খেলে উনি দৌড়ে এসে ধরেন। চারপাশটাকে কিভাবে যেন খুব সহজে বুঝতে পারেন। দেখা গেল আমার জুতার ফিতাটা খোলা। এত ঝামেলার মধ্যেও তিনি হঠাত্ করে বলেন, ‘এই পিপলু তুমি জুতার ফিতা বাঁধো। পড়ে যাবে তো।’ তিনি খেতে যাবেন, আমাদেরও জিজ্ঞেস করতে ভোলেন না, খেয়েছি কি-না। এই যে ছোট ছোট জিনিস, এগুলো খুবই সারপ্রাইজিং। ৫ বছরে কত শত অভিজ্ঞতা হয়েছে!—কথাগুলো নির্মাতা পিপলুর।

এ ইতিহাস তরুণরা ভুলে গেছেন!

পুরো ৫ বছর সময় নিয়ে নির্মাণ করা হয় এই ডকুমেন্টারি—তথ্যটি দিয়েছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) নির্বাহী পরিচালক সাব্বির বিন শামস। ১৩ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট কনভেনশন হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত প্রকাশনার কাজ করে থাকি। আমরা অনেক সময় ধরে ভাবছিলাম তরুণদের জন্য ডকুমেন্টেশনাল কিংবা আর্কাইভের কোনো কাজ করতে পারি কি-না। বাংলাদেশের উন্নয়নের জায়গা থেকে শুরু করে, ইতিহাসের জায়গা থেকে শুরু করে, স্বাধীনতার জায়গা নিয়ে আমরা মুজিব গ্রাফিক নভেলের কাজ করেছি। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখছি বাংলাদেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে। তার যে উন্নয়নের রাজনীতি সেই সম্পর্কে আমরা একটি ধারণায় পৌঁছেছি। গত কয়েকদিন আগেও আমরা তরুণদের সঙ্গে একটি ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় গিয়ে দেখি, তরুণরা ১৯৯০ সম্পর্কে ভুলে গেছেন। রাস্তায় পাখির মতো মানুষ মারা হয়েছে, সেসময় শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলনে। এ ইতিহাস তরুণরা ভুলে গেছেন!’

সাব্বির বিন শামস আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাজগুলোতে টার্মস অব রেফারেন্স হচ্ছে বঙ্গবন্ধু যে কাজগুলো অসমাপ্ত রেখে গেছেন। তখন আমরা চিন্তা করলাম এ রকম একটা কাজ করতে পারি কি-না। এটা ডকুমেন্টেশন হতে পারে কিংবা গ্রহণযোগ্য একটা কাজ আমরা করতে পারি কি-না। আমরা অ্যাপেলবক্সের সঙ্গে বসে কোন ধরনের মানুষ আসবে, এটা কীভাবে সামনে এগুবে—এগুলো সবই নির্ধারণ করি। ৫ বছর ধরে কাজ করে, ২ বছরের মতো সময় লেগেছে একটা জায়গায় দাঁড় করাতে। আমাদের এই কাজে শেখ রেহানার সন্তান এবং সিআরআইয়ের ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক নিজে প্রতিটি জায়গায় গিয়ে সব সময় নিবিড়ভাবে সঙ্গে ছিলেন। আমাদের আরেকজন ট্রাস্টি নসরুল হামিদ বিপু সম্ভাব্য সব চেষ্টা করে গেছেন।’

 

বিষাদ, বিজয় ও নৈকট্যের গল্প

এই তথ্যচিত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের বিষাদ, বিজয় ও নৈকট্যের গল্পগুলোকে নিজের স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন পরিচালক রেজাউর রহমান খান পিপলু। এই ডকুমেন্টারির সবচেয়ে বেশি শুটিং হয়েছে গণভবন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। এছাড়াও অনেক সময় সরকারি কিছু অনুষ্ঠানে দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর শেখ জার্মানি, ব্রাসেলস থেকে শুরু করে দিল্লি যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানে যেতে হয় পুরো নির্মাণ টিমকে। তবে এই তথ্যচিত্রকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর শুটিংয়ের বিষয়টি দেশেই রাখা হয়েছে। দেশের বাইরের জায়গাগুলোতে শেখ হাসিনাকে যেতে হয়নি।

‘আমার সাধ না মিটিলো’

প্রকল্পটির সাথে যুক্ত ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্দেশক এবং সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র। কী কারণে বহুল প্রতীক্ষিত এই ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রে দেবজ্যোতি মিশ্রকে যুক্ত করা হয়েছে? উত্তরে পিপলু বলেন, ‘এর আগেও বেশকিছু বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করা হয়েছে তার সাথে। আর এবার মুম্বাইয়ে ডকুড্রামাটির প্রযোজনা পরবর্তী কাজ করাটাও বরাবরের মতোই খুব উপভোগ্য ছিল। তাছাড়া আমি চেয়েছিলাম একজন বাঙালি সঙ্গীত পরিচালক এই ডকুড্রামার কাজটি করুন। যিনি বাংলা জানেন, যিনি এই অঞ্চলের এবং যিনি এই প্রজেক্টের তাত্পর্য অনুধাবন করতে পারেন। দেবজ্যোতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন বাঙালি সঙ্গীত পরিচালক। তার সঙ্গীতের ধারণাও উচ্চমার্গীয়। সঙ্গীত বিষয়ে আমার নিজেরও কিছুটা ধারণা রয়েছে আর আমরা একসাথে এরইমধ্যেই বেশকিছু কাজও করেছি।’

ডকুড্রামাটিতে ‘আমার সাধ না মিটিলো’ নামের একটি শ্যামা সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে পিপলু বলেন, ‘গানটি বঙ্গবন্ধু খুব পছন্দ করতেন আর নিয়মিত তা শুনতেন। তাছাড়া আমি যখন শেখ হাসিনার সাথে কাজ করছিলাম, তার সাথে কোনো কথা হচ্ছিল বা শুটিং করা হচ্ছিল, প্রায়শই এই গানের কথা উঠতো, যে কারণে এই প্রজেক্টের সাথে গানটির এক ধরণের যোগসূত্র আছে। আমি তখনই ঠিক করেছিলাম গানটি ব্যবহার করবো। কেননা, এর মাঝে নিহিত আছে একজন কন্যার পিতা হারানোর বিলাপ, বাঙালি জাতির অপূরণীয় ক্ষতি আর এর পেছনের সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি।’

আওয়ামীলীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) ও অ্যাপেলবক্স ফিল্মস-এর যৌথ প্রযোজনায় ডকুফিল্মের চিত্রগ্রহণে ছিলেন সাদিক আহমেদ। এটি সম্পাদনা করেছেন নবনীতা সেন।