২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চলে গেলেন লেখক-সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ। পরদিন (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকালেই শুনলাম ব্যাংকার-অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের চিরবিদায়ের খবর। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই দুই সজ্জন ও বিদগ্ধ মানুষের মৃত্যুর খবর শুনে এতটাই বিহ্নল হয়ে পড়েছি, যা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। এই দুই গুণী মানুষের সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিল আমার স্বামী অজয় রায়ের মাধ্যমে। অজয় রায়ের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই আমিও তাদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছি। আমাদের বাসায় তাদের যাওয়া-আসার কারণে তাদের ব্যক্তিগত জীবনাচার সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ ও খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ—দুই জন দুই আলাদা পেশার মানুষ হলেও একটি ক্ষেত্রে ছিল তাদের অনেক মিল। তারা দুজনেই দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ভালোবাসাতেন দেশের মানুষকে। সত্য প্রকাশে দুজনেই ছিলেন নির্ভীক। দুজনেই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। ছিলেন সদালাপী ও মৃদুভাষী। জ্ঞান পিপাসু এই দুই অসাধারণ মানুষ নিজেদের জাহির করতেন না। আবার মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে চুপচাপ ঘরে বসে নীরবে চোখের জল না ফেলে প্রতিবাদ করতেন নিজেদের মতো করে, নিজেদের পছন্দের প্ল্যাটফরম থেকে। দুজনেই ছিলেন, উদার, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত মনের মানুষ। তারা দুজনেই জানতেন কাকে ভালোবাসাতে হয়, কাছে টানতে হয় আর কাকে ঘৃণা করতে হয়, আপন উঠোন মাড়াতে দিতে হয় না। এদের সঙ্গে কবে, কখন কীভাবে পরিচিত হয়েছিলাম, সেটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, এখন। বরং মনে হয়, আহা, আর কোনো দিন তাদের কাছে যেতে পারব না, জানতে পারব না কখন, কোনো বিষয়ে আমাদের প্রতিবাদ করা উচিত। ভালো-মন্দের তফাত্ করতে পারার মতো মানুষ একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছেন। এক বড় শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। খারাপ মানুষের আস্ফাালন, দাপটের মুখে বিপন্ন জনস্বার্থের রক্ষক হিসেবে যারা আমাদের ভরসা ছিলেন, তাদের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হয়। মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে, চোখ ভিজে আসে।
আমরা যখন ওয়ারীর র্যাংকিন স্ট্রিটে থাকতাম, তখন ইব্রাহিম খালিদ ছিলেন লারমিনি স্ট্রিটে। সামান্য দূরত্ব। তিনি তখন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বড় পদ। কিন্তু কত সাধারণ ছিল তার চালচলন। একটি সাধারণ মানের শার্ট গায়ে দিয়ে লুঙ্গি পরে নিজেই বাজার করতে যেতেন। বলতেন, নিজের কাজ নিজে করার আনন্দই আলাদা। হ্যাঁ, তিনি যা করতেন, আনন্দ নিয়েই করতেন। এমনকি নিজের পরিধেয় জামাকাপড়ও নিজেই ধুতেন। আমাদের বসার ঘরে অজয় রায়ের সঙ্গে তিনি কত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। অবশ্যই তাদের আলোচনা বড় অংশ জুড়েই থাকত অর্থনীতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে। কীভাবে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, সরকারের কী করা উচিত, সরকারি নীতি-কৌশলে কোনো গলদ থাকলে তা কীভাবে দূর করা যায়—এসব নিয়ে তারা দীর্ঘ আলাপআলোচনা করতেন। অজয় রায় তার প্রশংসা করতেন, তাকে পছন্দ করতেন।
ইব্রাহিম খালেদ অগ্রণী ছাড়াও সোনালী, রূপালী এবং কৃষি ব্যাংকেও প্রধান নির্বাহী বা অন্য পদে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবেও তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি কোনো সময় সত্য বলা থেকে বিরত থাকেননি। যখন যে দায়িত্ব পেয়েছেন, সেটাই শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। কারো তদ্বির বা চাপে কিছু করেননি। কাউকে খুশি করার জন্য, কারো মুখ চেয়ে তিনি কথা বলতেন না। নিজের কাছে যা সঠিক মনে হতো তিনি সেটা বলতে দ্বিধা করতেন না, ভয় পেতেন না। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর সরকার তাকে প্রধান করে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির প্রতিবেদনে সত্য উদ্ঘাটনে কোনো বিচ্যুতি ছিল না। কিন্তু যেহেতু কেলেঙ্কারির হোতারা বেশি প্রভাবশালী সেহেতু সেই তদন্ত প্রতিবদেন আলোর মুখ দেখেনি।
আমরা ওয়ারী থেকে ধানমন্ডি চলে আসি। ইব্রাহিম খালেদও ধানমন্ডিতে আসেন। অজয় রায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সামাজিক আন্দোলনের সেমিনারে উপস্থিত থাকার জন্য অজয় রায় অনুরোধ করলে তিনি তা রাখার চেষ্টা করতেন। তার একাধিক আলোচনা শোনার সুযোগ আমার হয়েছে। রবীন্দ্র অনুরাগী ইব্রাহিম খালেদ প্রচুর পড়াশোনা করতেন। তিনি জানতেন বেশি, বলতেন কম। আমাদের দেশে সাধারণত আমরা উলটোটা দেখি অর্থাত্ যারা কম জানে, তারাই বেশি বলে। ইব্রাহিম খালেদ সভা-সেমিনারে খুব গুছিয়ে এবং যুক্তি দিয়ে সুন্দর আলোচনা করতেন। তিনি লেখালেখিও করতেন। তার লেখাও পাঠকপ্রিয় ছিল।
শিশু-কিশোর সংগঠন ও কচিকাঁচার মেলার তিনি ছিলেন একজন অন্যতম সংগঠক। ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এবং শিল্প-সংস্কৃতচর্চার মাধ্যমে পরিশীলিত উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কচিকাঁচার মেলার ভূমিকাকে তিনি উজ্জ্বল করে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি এই সংগঠনের পরিচালক, নির্বাহী পরিষদের সভাপতি এবং স্ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিনি চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেও সেবামূলক কাজকর্ম থেকে অবসর নেননি। দেশভাবনায় উত্সর্গিত তার জীবনটাকে তিনি মানুষের কল্যাণ চেষ্টায় আমৃত্যু নিয়োজিত রেখেছেন। অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই মানুষটির মৃত্যু দেশের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হলো।
সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গেও অজয় রায়ের কারণেই আমারও পরিচয় ঘটেছিল। তিনিও আমাদের বাসায় একাধিকবার এসেছেন। আলাপ-আলোচনা যেমন হয়েছে, তেমনি দু-এক বেলা আমরা একসঙ্গে আহারও করেছি। মকসুদ ভাই নিরামিষ তরকারি পছন্দ করতেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদের পড়াশোনার পরিধিও বিস্তৃত ছিল। তিনি গবেষণামূলক কয়েকটি বই লিখেছেন। তিনি সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চাকরি ছেড়েছেন লেখালেখির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতিবাদে। তিনি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন, তবে তার লেখার বিষয়বস্তু শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ইরাকে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরা শুরু করে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি তার প্রতিবাদী বৈশিষ্ট্য আমৃত্যু ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। দলীয় বৃত্তে বন্দি না হয়ে সততার সঙ্গে সত্য বলার মানুষ যখন কমে আসছে তখন সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন এক উদাহরণযোগ্য ব্যতিক্রম।
আমরা গত কয়েক মাসে আমাদের হূদয় আকাশের অনেকগুলো উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন দেখে বেদনাভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছি। জীবন ও মৃতু্যু অতি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও নক্ষত্র পতন সহজভাবে মেনে নিতে মন সায় দেয় না। এসব বিদায় আমাদের নিঃস্ব করছে। এই দুঃখ দিনে রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে বলতে হয় :
‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু
বিরহ দহন লাগে।
তবু শান্তি, তবু আনন্দ
তবু অনন্ত জাগে।’
n লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজকর্মী