৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৬-এর স্বাধীকার আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের ভয়াবহ সেই কালরাত্রি, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়।—এ যেন ধাপে ধাপে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াকে নির্দেশ করে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চবি’র ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর পর প্রথমবারের মতো নির্মিত হওয়া জয় বাংলা ভাস্কর্যের গল্প বলছেন রুমান হাফিজ ও এএইচ আজহার
প্রতিষ্ঠার পর ৫১ বছর পার করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অপরাজেয় বাংলা’, ‘স্বাধীন বাংলা’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্ফুলিঙ্গ’সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক নানা ঘটনার স্মৃতি সংবলিত ভাস্কর্যের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভাস্কর্য শূন্য। অবশেষে সেই শূন্যতা পূরণ হলো ‘জয় বাংলা’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভাস্কর্য স্থাপনের মাধ্যমে।
ভাস্কর সৌরভ জাহানের কথা
দুটি স্তরে সাজানো হয়েছে ভাস্কর্যটি। নিচের অংশে রয়েছে ১৮ জন তরুণ শিক্ষার্থীর অবয়ব। এই অংশটি দ্বারা বর্তমান তরুণ প্রজম্মের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে। অন্যদিকে ওপরের স্তরে রয়েছে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব। এই তিনজনের মধ্যে দু’জন পুরুষ ও একজন নারীর অবয়ব। এর দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে নারী ও পুরুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকেই তুলে ধরা হয়েছে।
সৌরভ জাহান আরো জানান, ভাস্কর্যে দু’জন পাহাড়ি বাঙালির অবয়ব রয়েছে। যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাঙালিদের অংশগ্রহণও তুলে ধরা হয়েছে।
ভাস্কর্যটির উচ্চতা ২০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১৮ থেকে ২০ ফুট। এরমধ্যে ওপরের স্তরে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার উচ্চতা ১১ ফুট এবং নিচের স্তরের প্রতিটি অবয়বের উচ্চতা ৫ ফুট। এছাড়া ভাস্কর্যটির ওপরের অংশে সমসাময়িক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং নিচের অংশ নির্মাণের ক্ষেত্রে লাইফ কাস্টিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যের দৃশ্যমান রূপ দেখে আনন্দিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই। এরই প্রতিফলন ঘটিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের সর্বত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই ভাস্কর্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুবা জাহান রুমি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের কালিমা মুছে দিয়ে সগৌরবে দাঁড়ানো মুক্তিযুদ্ধের গণমানুষের ভাস্কর্যের নাম জয় বাংলা। যদিও এ ভাস্কর্যের জন্য আমরা দীর্ঘদিন চবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন করার ফলস্বরূপ এ ভাস্কর্য পেয়েছে। আমাদের এই ভাস্কর্য মৌলবাদমুক্ত চবি ক্যাম্পাসের প্রতীক হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকবে।
তরুণদের চেতনায়
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহামুদুল হাসান শিবলী বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার মানদণ্ডে দেশের অন্যতম একটি বিদ্যাপীঠ। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও চবি ক্যাম্পাসে ছিল না কোনো ভাস্কর্য। একমাত্র ভাস্কর্য জয় বাংলা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নতুন একটি মাইলফলক অর্জন করলো। সেই অর্জনের জায়গা থেকেই বলবো বজ্রমুষ্ঠি হাত আর উঁচিয়ে ধরা রাইফেল তরুণদের চেতনার ভিতকে করবে আরো শক্ত আরো মজবুত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সহস্রবার সোচ্চার হয়ে উঠবে প্রতিটি প্রাণ। ভাস্কর্যের যথাযোগ্য মর্যাদা রক্ষা করে এবং স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় আগামীতে আরো এগিয়ে যাবে বলে আমি আশা রাখি।
গত ২৫ অক্টোবর সোহরাব জাহানের নির্মিত ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যের উদ্বোধন করেন বিশ্বদ্যািলয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। ভাস্কর্যটি নির্মাণে সহযোগী হিসেবে ছিলেন জয়াশীষ আচার্য ও মুজাহিদুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী চত্ত্বরের মাঝামাঝি চৌরাস্তার মধ্যভাগে ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে।
ছবি:মাহমুদুল হাসান সোহেল