ধীরে হইলেও আগাইতেছে

ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই একটি সমাজ ক্রমশ বসবাস-উপযুক্ত হইয়া উঠে। সময়ের প্রয়োজনে পুলিশের ভিতরেও ক্রমশ ইতিবাচক পরিবর্তন আসিতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক খবর। সম্প্রতি ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, দেশের মানুষের জন্য পুলিশি সেবা বৃদ্ধি করিতে বাহিনীতে যুক্ত হইতেছে নূতন নূতন ইউনিট। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে সর্বমোট ইউনিট রহিয়াছে ১৭৭টি। ইহার সহিত নূতন করিয়া যুক্ত হইতেছে মেডিক্যাল, শিক্ষা ইউনিট, এয়ার উইংসহ আরো একাধিক ইউনিট। পুলিশের সদস্যসংখ্যা বর্তমান ২ লক্ষ ১২ হাজার। যদিও উন্নত বিশ্বের অনুপাতে জনসংখ্যা অনুযায়ী বাংলাদেশে পুলিশের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত ভাগের এক ভাগ। তবে কেবল সংখ্যাই নহে, পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই দিকটিতেই বর্তমানে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে, যাহা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে পুলিশের আইজি আশা করিতেছেন, বিশ্বে রোল মডেল হইবে বাংলাদেশ পুলিশ। অসত্ কোনো কর্মকর্তা এই বাহিনীতে থাকিতে পারিবেন না। সত্ কর্মকর্তারাই টিকিয়া থাকিবেন। মাদক, দুর্নীতিসহ অনিয়মের সহিত জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইবার কথাও তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করিয়াছেন।

আমরা এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও প্রায়শই দেশের সকল ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সদস্যদের আরো আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাইয়া থাকেন। ইহাও সত্য যে, যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসিয়াছে সেই সরকারই পুলিশকে দক্ষতার সহিত কাজ করিবার কথা বলিয়াছে। কিন্তু সাধারণ জনগণের নিকট পুলিশের নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয়চিত্র কতখানি স্পষ্ট? মূলগত প্রশ্ন হইল, আমাদের কেন পুলিশ বাহিনী রহিয়াছে? নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানই ইহার প্রধান লক্ষ্য। উন্নত বিশ্বে আইনের শাসন নিশ্চিত করিতে পুলিশের বিকল্প নাই। এই জন্য পুলিশ শব্দের প্রথম ‘পি’ অক্ষরের অর্থ হইল পিস—অর্থাত্ শান্তি। শিল্পোন্নত দেশে ইহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কিন্তু এই উপমহাদেশের জনমানসে পুলিশ বহুকাল ধরিয়া বহু ক্ষেত্রেই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। প্রথাগত ভীতি এইরূপ যে, বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। তবে এই নেতিবাচক চিত্রের পরিবর্তন ক্রমশ দৃশ্যমান। বর্তমানে থানায় গিয়া অতীতের তুলনায় পুলিশের নিকট হইতে অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পায় সাধারণ জনগণ। রহিয়াছে জরুরি সেবা ৯৯৯। ইহার থলিতে রহিয়াছে অনেক ইতিবাচক ঘটনা। তবে তাহার পরও পুলিশি হেফাজতে অত্যাচার, জুলুম, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না—সরিষার মধ্যে ভূত থাকিলে ভূত তাড়ানো দূরে থাকুক, উহারা ঝাড়ে-বংশে আরো বৃদ্ধি পায়। আর কেবল পুলিশ বাহিনী নহে, সরকারের সকল অঙ্গেরই ক্ষত দূর করা প্রয়োজন। কোনো অঙ্গকে অসুস্থ রাখিয়া অন্য অঙ্গগুলির নিকট হইতে সুস্থ কার্যকলাপ আশা করা যায় না। তবে আশার কথা হইল, পুলিশ বলিয়া যাহা খুশি তাহা করিয়াও রক্ষা পাওয়া যাইবে—সেই অরাজক দিন ক্রমশ বদলাইতেছে। এমনকি ২০১৩ সালে প্রণীত ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইনে কিছুদিন পূর্বে তিন পুলিশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, ৮০ শতাংশ অপরাধই সংঘটিত হইয়া থাকে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়। নিয়ম অনুযায়ী আইন থাকিবে আইনের জায়গায়, ক্ষমতা থাকিবে ক্ষমতার জায়গায়। সুতরাং যদি এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় যে, কোনোভাবেই প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করা হইবে না—তাহা হইলে পুলিশ দক্ষতার সহিত কাজ করিতে পারিবে। আমরাও একদিন উন্নত বিশ্বের মতো উন্নত পুলিশ পাইব নিশ্চয়ই।