অণুগল্প লটারি

 

কথায় বলে, বউ না থাকলে বাতিক থাকে। আমার ছোট মামার বউ ছিল না, কিন্তু একটা বাতিক ছিল। একে বাতিক না বলে ‘হবি’ও বলা যেতে পারে। হবি বাড়াবাড়ি হলে তাকে বাতিক বলা হয়।

বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে দশ টাকা, বিশ টাকা মূল্যের লটারির টিকিট বিক্রি শুরু করে। টিকিট বিক্রির জন্য আকর্ষণীয় মূল্যের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পাঁচ হাজার টাকা থেকে চল্লিশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের পুরস্কারের জন্য জনগণের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। রিকশায়, ভ্যানগাড়িতে মাইক বাজিয়ে টিকিট বিক্রি হতে থাকে। ছোটখাটো মুদি দোকানেও লটারির টিকিট পাওয়া যেত।

একবার ছোট মামাকে তাঁর বাবা অর্থাত্ আমার নানা তাঁর জন্মদিনে দুটো লটারির টিকিট উপহার দেন। সেবার ছোট মামা লটারিতে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার পান। পুরস্কার পাবার পর ছোট মামার লোভ বেড়ে যায়। এরপর থেকে দেশে যতবার লটারির টিকিট ছাড়া হয়, ছোট মামা তার একটাও কিনতে বাদ রাখেননি। লটারির টিকিট কেনা ও জমানো তাঁর নেশা হয়ে দাঁড়ায়। টিকিটে তাঁর ঘর ভরে যায়। ঘরের তাকে সাজানো থাকে বিভিন্ন সময়ে কেনা তাঁর লটারির টিকিট। আমরা তাঁর ঘরের নাম দিয়েছিলাম ‘লটারি জাদুঘর’। আমরা তাঁকে ‘লটারি মামা’ ডাকতে শুরু করি। আমরা তাঁর কাছে কোনো জিনিস চাইলে তিনি বলতেন, একটু সবুর কর, এবার লটারি জিতলেই তোদের সবকিছু কিনে দেব। আমরা তাঁর লটারি জেতার অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু তাঁর লটারি জেতা আর হয়ে ওঠে না। আমরা হতাশ হয়েও ভবিষ্যতে পাবার আশায় দিন গুনি।

একবার আমাদের পাশের গ্রামের রিকশাওয়ালা জমীর আলী লটারি জেতে, পুরস্কার হিসাবে চল্লিশ লাখ টাকা পায়। টাকা পেয়েই জমীর আলী বাড়িঘরসহ বিশ বিঘা জমি কিনে ফেলে। ফলের বাগান, মুরগির খামার ও ধান চাষ করে অল্প সময়ে সে বিত্তশালী হয়ে ওঠে। বর্তমানে সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সবচেয়ে বড়ো দুঃখের ব্যাপার হলো, জমীর আলীর টিকিটের পরের নাম্বার ছিল ছোট মামার। অল্পের জন্য তাঁর চল্লিশ লাখ টাকা হাতছাড়া হয়ে যায়। এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে।

একদিন ছোট মামা আমাকে তাঁর ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, লটারির টাকা পেলে আমি প্রথমেই একটা গাড়ি কিনব, তোদের নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাব। বাকি টাকা দিয়ে গরিব ছেলেমেয়েদের জন্য একটা স্কুল করে দেব। এরকম আরো অনেককিছু। আমি মাথা নেড়ে সায় দিই।

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। এখনো দেশে লটারির টিকিট বিক্রি হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ছোট মামা দেশের বাড়িতে। শুনেছি ছোট মামা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক চিকিত্সা হয়েছে। কোনো ফল হয়নি। তিনি কারো কোনো ক্ষতি করেন না। কারো সাথে কথা বলেন না। কোনো কাজও করেন না। নিজের লটারি যাদুঘরে একাকী বসে সময় কাটান। মাঝেমাঝে আপনমনে কথা বলেন আর মিটিমিটি হাসেন। কাউকে দেখলে নতুন লটারি ছাড়া হয়েছে কি না তার খবর জানতে চান। শয়নে, স্বপনে লটারিই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান।

সম্প্রতি আমাদের এলাকার পৌরসভার নির্বাচনে ভোট দেবার জন্য আমি দেশের বাড়ি যাই। আমি সেখানকার ভোটার। লক্ষ করলাম, বেশিরভাগ মানুষ ভোটদানে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেছে। তারা জানে, ভোট মানে মারামারি, কাটাকাটি। পেশিশক্তি আর অর্থবলে প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। তবু আমি ভোট দেয়াকে আমার নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করি।

ভোটের দিন সকালে আমাকে ঘর থেকে বের হতে দেখে ছোট মামা অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বললেন, ভোট দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এ বছর সরকার ভোটদানে উত্সাহিত করার জন্য প্রত্যেক ভোটারকে বিনামূল্যে লটারির টিকিট দিয়েছে। গত রাত্রে স্বপ্নে দেখেছি লটারির প্রথম পুরস্কার—এক কোটি টাকা আমি পেয়ে গেছি। এ টাকা দিয়ে আমি গাড়ি কিনব, বাড়ির সামনে স্কুল দেব। সেখানে তুই ছাত্রছাত্রীদের পাড়াবি। তোকে অনেক টাকা বেতন দেব।

ছোট মামার কথায় কোনো জড়তা নেই। তাঁর মধ্যে মানসিক বিকৃতির কোনো লক্ষণ আমি দেখতে পেলাম না। প্রথম পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রাপ্তির তৃপ্তির হাসি তাঁর চোখেমুখে।