ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের (৫৩) লাশ গতকাল শুক্রবার দুপুরে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে জানাযা শেষে রাতে লাশ রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে মৃত্যুর ঘটনায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দিন বাদী হয়ে গাজীপুর মহানগরের সদর থানায় অপমৃত্যু মামলা করেছেন। এছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্নের পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতে লাশের ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে। গত বছরের ৫ মে রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকা থেকে মুশতাককে আটক করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)। ওইদিন রাতেই রমনা থানায় মুশতাকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করে র্যাব। মামলার এজাহারে বলা হয়, তারা রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ করেছেন। পরে তাদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। গত ২৪ আগস্ট থেকে তিনি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। এরপর গত ১১ জানুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, লেখক মুশতাক আহমেদ ও রাষ্ট্রচিন্তার কর্মী দিদারুল ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ। গত সেপ্টেম্বরে এই মামলায় গ্রেফতার মিনহাজ মান্নান ও দিদারুল ভূঁইয়া জামিনে মুক্তি পান। তবে কার্টুনিস্ট কিশোর ও লেখক মুশতাকের জামিন হয়নি। ছয় বার মুশতাকের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত।
ইত্তেফাকের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, লেখক মুশতাক আহমেদের (৫৩) লাশের ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ১২টার দিকে মোশতাক আহমেদের পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে কারা কর্তৃপক্ষ। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন হয়। পরে ওই হাসপাতালের মর্গে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন চিকিত্সকরা।
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন জয়দেবপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ বায়েজীদ জানান, তার পিঠের মধ্যভাগে যেকোন সময় ‘ঘা’ হয়েছে এমন দাগ পাওয়া গেছে। ডান হাতে হালকা লালচে কালো ছোট দাগ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে আনার সময় বা গাড়িতে উঠানোর সময় এ দাগ হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বলা যাবে কোন অসঙ্গতি আছে কীনা।
শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শাফী মোহাইমেন জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মৃত অবস্থায় তাকে এ হাসপাতালে আনা হয়েছে। দৃশ্যত গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে। তিনি আরো বলেন, তবে মত্যুর কারণ অধিকতর নিশ্চিত করতে তার ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে। তা দিয়ে ঢাকার সিআইডি’র ল্যাবে কেমিকেল এনলাইসিস এবং ঢাকা মেডিক্যালে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করা হবে।
কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের ভেতরেই মোস্তাক আহম্মেদ হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক রাত ৮টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুশতাক আহমেদের বড় ভাই ডা. নাফিছুর রহমান বলেন, ‘তার মরদেহ আমি নিজে দেখেছি। কোনো প্রকার সমস্যা আমার চোখে পড়েনি। ময়নাতদন্ত হয়েছে। প্রতিবেদন ছাড়া আমি এ ব্যাপারে কী বলব? আমাদের কোনো অভিযোগ নাই। আমরা কোনো মামলাও করব না।’
দাফন সম্পন্ন
মুশতাক আহমেদ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার ছোট বালাপুর এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। লালমাটিয়ায় স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। দুপুরের পরে মুশতাকের লাশ লালমাটিয়ায় আনা হয়। বাসার নিচে তার লাশ আনা হলে সেখানে স্বজনদের ভিড় জমে। পরে বাদ মাগরিব লালমাটিয়া সি ব্লকের মিনার মসজিদে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার লাশ দাফনের জন্য আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত পৌন ১০টার দিকে তার লাশ দাফন করা হয়।
ছয়বার জামিন চেয়েও পাননি
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় দশ মাস ধরে কারাবন্দি ছিলেন মুশতাক। কারাবন্দি থাকাবস্থায় ছয় বার জামিন চেয়ে আবেদন করেন আদালতে। কিন্তু প্রতিবারই তার আবেদন নাকচ করে দিয়েছে আদালত। সর্বশেষ নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। সোমবার ঐ আবেদনের উপর শুনানি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগেই কারাগারে ভেতরেই তার মৃত্যু হয়।
বার বার জামিন চাওয়ার পরও প্রত্যাখাত হওয়া প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘জামিন না পাওয়াটা দু:খজনক। ইদানিং কিছু বিচারকদের মতামত থেকে আমার মনে হয়েছে যে তারাও ভাবমূর্তি রক্ষার ব্যাপারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ। এটা বিচার বিভাগের ভূমিকা নয়। সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতেই ডিজিটাল আইন করা হয়েছে। এই আইনের বিলোপ হওয়া দরকার।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, কারাগারে লেখক মোশতাকের আহমেদের মৃত্যু অনাকাঙ্খিত। উনি আইনি বৈষম্যের শিকার। আমি মনে করি তার জামিন পাওয়া উচিত ছিল।