সদিচ্ছাই পারে পরিস্থিতি বদলাইতে

দেশের সকল নদনদীকে মহামান্য হাইকোর্ট জীবন্ত সত্তা হিসাবে রায় ঘোষণা করিয়াছিলেন ২০১৯ সালের পহেলা জুলাই। ইহারও পূর্বে আমরা দেখিয়াছি, ভারতের একটি আদালত ২০১৭ সালে দেশটির দুইটি নদী—গঙ্গা ও যমুনাকে জীবন্ত সত্তার মর্যাদা দিয়াছিল। তাহারও পূর্বে নিউজিল্যান্ড তাহার হোয়ানগানুই নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসাবে আখ্যা দিয়াছিল। অনেকের মতে, নদনদীকে জীবন্ত সত্তা আখ্যা দেওয়াটা প্রতীকী হইলেও ইহার তাত্পর্য সুগভীর। বিশেষ করিয়া নদীকে রক্ষা করিবার ক্ষেত্রে ইহা একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। ভারতের আদালত তো এমন কথাও বলিয়াছিল যে, মানুষের মতোই নদীও মৌলিক অধিকার পাইবার যোগ্য।

আসলে নদীকে রক্ষার মাধ্যমে আমরা সরাসরি নিজেদেরই রক্ষা করি। কারণ আমাদের জীবন-জীবিকা নদীর সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশ-প্রতিবেশের দিক হইতেও মানবজাতির টিকিয়া থাকিবার অন্যতম মাধ্যম হইতেছে নদী। স্বাভাবিকভাবেই নাব্যসংকট ও বেদখলের হাত হইতে নদনদী রক্ষা করা সম্ভবপর না হইলে আমরা ক্রমশ অস্তিত্বসংকটে পড়িব। এই জন্য নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশেষ সচেতনতা সৃষ্টি হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে দেরিতে হইলেও বর্তমান সরকার নদী রক্ষায় আন্তরিকতার পরিচয় দিতেছে। ইংরেজি প্রবাদের মতো এই ক্ষেত্রে বলিতেই হয়—বেটার লেট দ্যান নেভার। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে যে, বত্সরের পর বত্সর দখলে থাকা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী খননে প্রাণ ফিরিয়া পাইতেছে। ইতিমধ্যে অবৈধ দখলমুক্ত করিয়া সেইখানে নদীর প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা ১০৫ ফুট খনন করা হইয়াছে। আশা করা যাইতেছে, এইভাবে সংকীর্ণ শীতলক্ষ্যা নদীতীরের আরো দুই কিলোমিটার এলাকা খনন করিবার মাধ্যমে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ মৃতপ্রায় এই নদীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরাইয়া আনিতে পারিবে। কেবল শীতলক্ষ্যাই নহে, দূষণ-দখলে মৃতপ্রায় দেশের সকল নদীকেই পুনরুদ্ধার করিতেই হইবে। নদী গবেষকদের মতে, ষাটের দশকে বাংলাদেশে সাড়ে সাত শতাধিক নদী ছিল। বর্তমানে এই সংখ্যা কমিয়া মাত্র ২৩০টিতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। অর্থাত্ অর্ধশতকের মধ্যে হারাইয়া গিয়াছে পাঁচ শতাধিক নদী। যদিও সরকারি হিসাবে দেশে এখন নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। তবে বাস্তবতা হইল, শুকনা মৌসুমে এই সকল নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। নদীগুলির এই মৃতপ্রায় দশার কারণ কী, তাহা কমবেশি সকলেই জানেন। ঢাকার চারিপাশের শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বুড়িগঙ্গার সর্বত্রই বহুদিন ধরিয়া চলিতেছে দখলবাজদের আগ্রাসি থাবা। প্রবহমান নদীর পানিতে বাঁশ-কাঠের মাচান তুলিয়া তৈরি করা হইয়াছে শতসহস  ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বালুমহাল। বিষাক্ত তরল বর্জ্যে বিপন্ন হইয়াছে পরিবেশ।

তবে বর্তমান সরকারের আমলে নদী রক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং কমিশনের একটি সক্রিয় ভূমিকা রহিয়াছে। এই ব্যাপারে আমরা আশাবাদী হইতে চাই। প্রকৃত অর্থে নদীর জমি উদ্ধারে অনেক ভালো আইন আছে; কিন্তু তাহার প্রয়োগে বিরাট ঘাটতি চলিতেছে বহুদিন ধরিয়াই। কয়েক মাস পূর্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) চেয়ারম্যান জানাইয়াছেন যে, বাংলাদেশে ৬৩ হাজারের অধিক নদী দখলদার চিহ্নিত করা সম্ভব হইয়াছে। কাজটি চলমান বিধায় এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরো বাড়িবে বটে। তবে এই দখলদারদের যথাযথভাবে চিহ্নিত করিতে হইলে পাকাপাকিভাবে নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং নদীর প্লাবনভূমি নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এই দুইটি কাজের মাধ্যমেই দখলদার নির্ধারণ ও তাহাদের উচ্ছেদের বিষয়টি সঠিকভাবে করা সম্ভব। জানা গিয়াছে, নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজটি দেশের কোথাও যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয় নাই। আমরা মনে করি, সঠিকভাবে নদী রক্ষায় আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হইলে এই ব্যাপারে অবহেলা কাম্য নহে। আরেকটি বিষয় হইল, শুধু উচ্ছেদ আর পুনর্দখল ঠেকাইলেই হইবে না। নূতন করিয়া দখল হইতেছে কি না—সেই দিকেও লক্ষ রাখিতে হইবে।