কেন বার বার রক্ত ঝরছে রাঙ্গামাটির সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলাতে? উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরকারি কার্যালয়ের অফিসে ঢুকে এক ইউপি মেম্বারকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর ফের আতঙ্ক বিরাজ করছে এই জনপদে। স্থানীয় নাগরিক সমাজ বলছে স্বার্থগত কারণে আধিপত্য ধরে রাখতে বেপরোয়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। তাই দিন দিন বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। যদিও এই সব সংঘাতের দায় নিতে চায় না এসব আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতারা। বুধবার দুুপুরে বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয় রূপকারী ইউপি মেম্বার সমর বিজয় চাকমাকে। নিহত সমর জনসংহতি সমিতি এমএন লারমার গ্রুপের কর্মী। এই সংগঠনটিসহ বাঘাইছড়িতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে পাহাড়ি আঞ্চলিক চারটি সংগঠন। তাদের কাছে মূলত এক প্রকার জিম্মি এলাকার সাধারণ মানুষ। স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে অস্ত্রধারীদের আনাগোনাও সহজ। তাই যখন তখন তারা জড়িয়ে পড়ছে সংঘাতে।
এ ব্যাপারে প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, একজন জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এটা আমাদের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানমাল রক্ষার্থে নিরাপত্তা আরো জোরদার করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সভাপতি সাব্বির আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। তারা সীমান্তপথে নিয়ে আসছে ভারী অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। তাই সীমান্তের গহীন এলাকাগুলো নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা জরুরি। তা না হলে আরো প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে।
রাঙ্গামাটি কলেজ সংসদের সাবেক জিএস জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো বিভক্ত হয়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির জন্য একটার পর একটা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। এটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে মেনে নেওয়া যায় না।
তবে এসব হত্যাকাণ্ডের দায় নিতে চাচ্ছেন না আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা। বার বারই তারা বলে আসছেন এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে তারা জড়িত নন। কে বা কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তা তারা জানেন না। হত্যার রাজনীতিতে তারা বিশ্বাসী নয়। রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়ি শাখার জেএসএসের সাংগঠনিক সম্পাদক ত্রিদীপ চাকমা বলেন, আমরা এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না। জনসংহতি সমিতি শুধু পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে যাতে করে চুক্তি পুরোপুরি দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। এভাবে হত্যাকাণ্ড হওয়া ঠিক নয়। যারা এসব করছে তারা কি কারণে করছে তারাই ভালো জানে।
জেএসএস এম এন লারমার কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, যারা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে তাদের টার্গেট মূলত আমরাই। আমরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কিছু করার ব্যাপারে বিশ্বাসী নই। আমরা চাই এলাকার শান্তি। আমরা শুধু পার্বত্য এলাকায় শান্তির জন্য শান্তিচুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। হত্যার রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাসী না।
রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ বলেন, রূপকারী ইউপি চেম্বারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি যে বা যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত আইনের মুখোমুখি করতে পারব। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে বাঘাইছড়ি উপজেলায় নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত কর্মীরা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে তাদের গাড়িবহরে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন আট জন। আহত হন ২০ জনের বেশি লোক। পুলিশের হিসাবে গত ৩ বছরে এই উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি হয়েছে।