সিরিয়া সংকট বদলে দিতে পারে বিশ্বরাজনীতি

পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে এক দেশের প্রতি অন্য দেশের আগ্রাসননীতি পরিলক্ষিত। ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে আসছে। আর এসব আক্রমণের মাধ্যমে জয়লাভ করার ফলে বিজিত রাষ্ট্রে বিজয়ী রাষ্ট্র শাসনকার্য পরিচালনা করত। আর এই ধারার শেষ পর্যায়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমরা পূর্বের এমন নীতিই দেখতে পাই। যেখানে অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তির সক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়। আর এই সক্ষমতার ফলে বিশ্ব বিভীষিকাময় অবস্থা দেখতে পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি পরাজয়ের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে দুইটি দেশ অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। একটির নাম যুক্তরাষ্ট্র এবং অপরটির নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এই দুই পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট অনেকাংশে পরিবর্তন হয়।

বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বিরাজ করে। এমন আধিপত্যের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের এমনই একটি সংকটময় দেশের নাম সিরিয়া। সিরিয়া সংকট শুরু হয় মূলত ২৬ জানুয়ারি ২০১১ সালে। যেদিন তিউনিসিয়ার মতো হাসান আলী আকলেহ নামক এক সিরিয়ার নাগরিক নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেন। যার ফলে ২০১১ সালের মার্চে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ শুরু হয়। সরকারি বাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর গুলি চালায় যার ফলে অনেক লোক হতাহত হয় এবং কিছু সেনাসদস্য বিদ্রোহীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করলে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়। এসব বহিষ্কৃত সেনাসদস্যরাই পরবর্তী সময়ে গিয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গঠন করে। আর এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল আসাদ পরিবার কর্তৃক সিরিয়ায় ৫০ বছর একনায়ক শাসনতন্ত্র। যার ফলে এই গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয় দুইটি গ্রুপের মধ্যে—একদিকে আসাদ সরকার অন্যদিকে গণতন্ত্রকামী সাধারণ জনগণ। আর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো দুটি মেরুতে অবস্থান করে—একদিকে আসাদ সরকারকে সমর্থন দানকারী রাশিয়া, চীন, ইরান অবস্থান করে। আর অন্যদিকে সরকারবিরোধীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কাতার, ফ্রান্স, ব্রিটেনের অবস্থান। আর এমন অবস্থানের কারণেই সিরিয়া সংকট ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব আমরা সিরিয়া সংকটে দেখতে পাচ্ছি। ভৌগোলিকভাবে রাশিয়া হলো সিরিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ। রাশিয়া কখনো চাইবে না যে, অন্য কোনো পরাশক্তি সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করুক। এছাড়াও সিরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার অনৈতিক সম্পর্ক বিরাজমান। অন্যদিকে আমেরিকা ও তার মিত্ররা কখনো সিরিয়াকে হাতছাড়া করতে চাইবে না, কারণ ভৌগোলিকভাবে সিরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। সিরিয়া সংকট শুরুর পর থেকে রাশিয়া এবং আমেরিকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ লাভ করেছে। বর্তমানে এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন এই দ্বন্দ্বটা রাশিয়ার দিক থেকে ঘুরে ইরানের দিকে মোড় নিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার আমেরিকা সিরিয়ায় হামলার ফলে ১৭ জন নিহত হয়েছে। এবং এই হামলার ফলে দ্বন্দ্বের নাম হয়েছে আমেরিকা-ইরান দ্বন্দ্ব। যেখানে এই হামলার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উল্লেখ করেছেন যে, এই হামলাটা হলো ইরানের জন্য একটা সতর্কবার্তা। আর তাছাড়া ইরান বরাবরই সিরিয়া সরকারের সমর্থক। এবং তারা সিরিয়া সরকারকে অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে যা সিরিয়া সরকার গৃহযুদ্ধে ব্যবহার করে। আর বর্তমানে ইরান পারমাণবিক ইউরোনিয়াম ও উত্পাদন করছে যার ফলে আমেরিকা কিছুটা উদ্বিগ্ন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—বাইডেন যে ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা চুক্তিতে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা কতটা পূর্ণ হবে? সিরিয়া সংকট সমাধানে কতটা সফল হবে জাতিসংঘ—এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। যেখানে বিশ্বের বৃহত্ পরাশক্তিগুলোর শক্ত অবস্থান, সেখানে শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ কতটা হবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তাছাড়াও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলে সিরিয়ায় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলো ঘাঁটি স্থাপন করেছে। যেমন আইএস, আল-কায়েদা ইত্যাদি সংগঠনগুলোর ঘাঁটি স্থাপনের কারণে আমেরিকা তার সন্ত্রাস দমননীতি অব্যাহত রাখবে সিরিয়ার ভূমিতে—এমনটা বলায় যায়। সিরিয়া সংকটকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর এমন অবস্থান বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় কি না—সেটা এখন চিন্তার বিষয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়