গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমান বলেছেন, ‘কোনো রকম দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছি।’
গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।
সংবাদ সম্মেলনে সামিয়া রহমান বলেন, ‘তদন্ত কমিটি শুরু থেকে প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করেছেন। দীর্ঘ চার বছর তারা তদন্ত ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিটি মিটিংয়ের পর তদন্ত কমিটির দু-তিন জন সদস্য সাংবাদিকদের ডেকে আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তারা আমার বিরুদ্ধে রায় তৈরি করে রাখেন।’
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত বলেছে ন্যায়বিচার হয়নি। যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা এ ধরনের সুপারিশ করেনি বা রায় দেয়নি। ট্রাইব্যুনালের আহ্বায়ক ড. রহমত উল্লাহ, সদস্য জিনাত হুদা নিজে গণমাধ্যমে জানান, একদমই ন্যায়বিচার হয়নি। ড. রহমতউল্লাহ গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এটা প্লেজারিজম নয়। অথচ ভাইস চ্যান্সেলর বলে দিলেন ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ অনুযায়ী সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তো এই সুপারিশ করেনি।
তিনি বলেন, ‘শিকাগো জার্নালের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিসট্যান্ট অ্যালেক্স মার্টিন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ১০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ঐ জার্নালের যে চিঠির ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দীর্ঘ চার বছর ধরে মিডিয়া ট্রায়াল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শাস্তির সুপারিশ করেছে, ডিমোশন দিয়েছে—আসলে সেই চিঠিটিই সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভুয়া, বানোয়াট। শিকাগো জার্নাল থেকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের এই ধরনের কোনো চিঠি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঠানো হয়নি। এছাড়া অ্যালেক্স মার্টিন নামে শিকাগো জার্নালে কেউ কখনো কাজ করেনি। এমনকি শিকাগো ইউনিভার্সিটি এবং শিকাগো প্রেসেও অ্যালেক্স মার্টিন বলে কেউ নেই। শিকাগো জার্নালের এডিটর ক্রেইগ ওয়াকার জানিয়েছেন, অ্যালেক্স মার্টিন বলে কেউ কখনো শিকাগো জার্নালে ছিলেন না।’
সামিয়া রহমান বলেন, ‘গত চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের চাপে ও তদন্তাধীন বিষয় বলে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর এ সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা দিনের পর দিন প্রপাগান্ডা চালিয়েছে আমার বিরুদ্ধে। তাই বাংলাদেশের আদালতের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে আদালতেই যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো লেখা লিখিনি, জমা দিইনি, ডিন অফিসে আমার কাছ থেকে লেখার কোনো হার্ড বা সফট কপি জমা দেওয়ার কোনো প্রমাণ তদন্ত কমিটি এবং ট্রাইব্যুনাল পায়নি। রিভিউয়ারের কপিও আমার কাছে আসেনি। মারজান তদন্ত কমিটির কাছে লিখিতভাবে স্বীকার করেছে যে, সে জমা দিয়েছে, রিভিউয়ারের কপিও সে-ই নিয়েছিল এবং এটি তার অনভিজ্ঞতাবশত ও অনিচ্ছাকৃত ভুল, অথচ তদন্ত কমিটি বলছে কে জমা দিয়েছে দালিলিক প্রমাণ নাকি অস্পষ্ট। মারজান নিজে তদন্ত কমিটির কাছে জমা দেওয়া ও রিভিউ করার কথা লিখিতভাবে বলার পরও অস্পষ্টতার প্রমাণ তদন্ত কমিটি কোথায় পেল? এর প্রমাণস্বরূপ মারজানকে দেওয়া আমার মেইল পর্যন্ত তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিয়েছি। তদন্ত কমিটি সেক্ষেত্রেও নিশ্চুপ।’
সামিয়া রহমান বলেন, ‘এই বিতর্কিত নিবন্ধটি আমার লেখা নয়, নিবন্ধটি প্রকাশনার জন্য আমি জমাও দিইনি, রিভিউয়ারের রিপোর্ট সম্পাদনা পরিষদ থেকে আমার কাছে কখনই পাঠানো হয়নি এবং কোনো অ্যাকসেপটেন্স লেটারও আমার কাছে পাঠানো হয়নি। বিতর্কিত নিবন্ধটি যেহেতু আমি জমা দিইনি, সেহেতু জমা দেওয়া থেকে ছাপানো পর্যন্ত আমার কোনো সম্পৃক্ততা তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল খুঁজে পায়নি। আমি মারজানকে একটি আইডিয়া পাঠিয়েছিলাম মাত্র।’
প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করে সামিয়া রহমান বলেন, ‘এখন চ্যান্সেলর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে আমার আবেদন যেন তিনি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন এবং আমার বিশ্বাস তাহলে সব ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে আসে। এরপর তাদের শাস্তি নির্ধারণে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক রহমতুল্লাহকে প্রধান করে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের সুপারিশের ভিত্তিতে সামিয়া রহমানকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনমন এবং অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানকে শিক্ষা ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদানের পর দুই বছর লেকচারার থাকার সিদ্ধান্ত দেয় সিন্ডিকেট।