সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা

 ‘ঊষর মরুর ধূসর বুকে, ছোট্ট যদি শহর গড়ো/একটি শিশু মানুষ করা তার চাইতেও অনেক বড়।’ শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে। কিন্তু নানা কারণে ৬৫ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘প্রধান শিক্ষক’ ও ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে কর্মরত প্রায় চার লাখ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক প্রাপ্যতা অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাসে বন্দি। অর্ধ যুগেরও বেশি সময় আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণানুযায়ী ‘প্রধান শিক্ষক’ পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও আজো তাঁরা শ্রেণি অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন গ্রেড ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে, সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষকও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী! নেই ‘পদোন্নতি’ নামক প্রেষণার সুযোগও। সর্বশেষ নিয়োগবিধি অনুযায়ী নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে নিয়োগযোগ্যতা স্নাতক (সম্মান)  বা সমমানের ডিগ্রি। সম নিয়োগ যোগ্যতায় সরকারি অন্যান্য বিভাগের চাকরিজীবীদের ১০ম গ্রেডে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলেও প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকগণ ১১তম ও সহকারী শিক্ষকগণ ১৩তম গ্রেডে। দীর্ঘ আন্দোলন ও আলোচনান্তে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৪তম ও ১৫তম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হলেও এখনো সিংহভাগ উপজেলায় তা কার্যকর করা হয়নি। সরকারি অন্যান্য বিভাগে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও প্রাথমিকে সর্বশেষ খসড়া নিয়োগবিধিতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকতা ও প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পিটিআই)-এর ‘ইন্সট্রাক্টর’ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষকদের বিভাগীয় প্রার্থিতার সুযোগ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৮ হাজার সহকারী শিক্ষক কয়েক বছর আগে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষক হলেও আজো তাঁরা স্থায়ী পদোন্নতি পাননি। আবার পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির নিমিত্ত শিক্ষকদের দেড় বছর মেয়াদি ডিপিএড প্রশিক্ষণের পর গ্রেড বাড়লেও বেতন কমে যাওয়াটা খুব দুঃখজনক। সব মিলিয়ে সন্তোষজনক বেতনভাতা, প্রাপ্য পেশাগত ও সামাজিক মর্যাদা এবং অনেক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে একরকম কাগুজে মর্যাদাকর পেশায় পরিণত করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় মেধাবীদের আগ্রহী করতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া নিয়োগবিধির প্রয়োজনীয় সংশোধনপূর্বক সহকারী শিক্ষক পদ থেকে প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ক্রমান্বয়ে ওপরের নিয়োগযোগ্য পদগুলোতে স্বাভাবিক পদোন্নতির পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রার্থিতার সুযোগ পুনঃনিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে তাঁদের সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রাপ্তির বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে ত্বরান্বিত হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন।

আবু ফারুক

বনরুপা পাড়া, বান্দরবান