যে কোনো সমস্যা তাহা যতই গুরুতর হউক না কেন, যদি স্থায়ী রূপ লাভ করিয়া থাকে, তাহা একসময় গা-সওয়া ব্যাপারে পরিণত হইয়া যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকাসক্তি এমনই এক ভয়াবহ সমস্যায় পরিণত হইয়াছে। কেবল দেশের তরুণ-যুবকেরাই নহে, পূর্ণবয়স্ক এবং শিশু-কিশোররা, এমনকি নারীরাও জড়াইয়া পড়িতেছে মাদক গ্রহণ আর কারবারিতে। মাদকাসক্তির নাই কোনো নির্দিষ্ট এলাকা, রাজধানী ঢাকা শহর থেকে শুরু করিয়া প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটিয়াছে মাদকের। দেশের অসংখ্য স্থানে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা চলিতেছে, মাদকের এই সহজলভ্যতা যেন মহামারিকেও হার মানাইয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রি হইয়া থাকে। এমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে চাঁদা আদায় করিয়া তাহাদের নির্বিঘ্নে মাদক কারবারের পথ সুগম করিয়া দেন বলিয়া অভিযোগ আছে। তথাকথিত রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা হইয়া উঠে আরো বেপরোয়া। তাহারা নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগবাঁটোয়ারা করিয়া নিরাপদে, নিশ্চিন্তে দিনের পর দিন মাদকের সাম্রাজ্য গড়িয়া তোলে।
বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি লইয়া জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশে ৬৮ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যাহাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ আর ১৬ শতাংশ নারী। দেশ জুড়িয়া প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সহিত জড়িত। অবশ্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ, যাহার মধ্যে ৯০ শতাংশই কিশোর ও তরুণ। শুধু মাদকাসক্তিই নহে, মাদকের কারণে বিভিন্ন সময় হত্যাকাণ্ড, চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনাও নূতন নহে। মাদক কিনিবার টাকা না পাইয়া ছেলের হাতে খুন হইতেছেন বাবা-মা, ভাইয়ের হাতে ভাই কিংবা বোন। মাদকের টাকার জন্য তরুণ যুবকেরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি এমনকি অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়াইয়া পড়িতেছে।
ইহা সত্য, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করিতে দেখা যায়। তবে অভিযান পরিচালনার পরও মাদকের বিস্তার কোনো অংশে কমে নহে। ইহার কারণ হইল, অভিযানে মাদকের ছোট কারবারিরা ধরা পড়িলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায় গডফাদাররা। সরকারের পাঁচটি সংস্থার তালিকায় থাকা ১৪ হাজার মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে মাদকের গডফাদার রহিয়াছে ৯০০। বড় মাদক কারবারিদের অর্থের দাপটের কাছে প্রায়শই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অসহায় হইয়া পড়েন। এমনকি কোনো এক কর্মকর্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে চাহিলে দেখা যায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্যত্র বদলি হইয়াছেন।
মাদকের সমস্যা কেবল বাংলাদেশ কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, উন্নত দেশেও মাদকাসক্তি ভয়াবহ সমস্যারূপে স্বীকৃত। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে হেরোইন, কোকেন, ফেনসিডিলের মতো গুরুতর মাদকের বিস্তার রোধে প্রতিনিয়ত লড়াই করিয়া যাইতে হয়। মাদকের সমস্যা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হইলেও আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি। আমাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নের স্বার্থেই মাদক বাণিজ্য ও তাহার ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। ইহা দুইভাবে করা যাইতে পারে—প্রথমত, মাদকের সাপ্লাই বা সরবরাহ বন্ধ করিয়া। এর জন্য সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মাদক বাণিজ্যের হোতাদের মূলোত্পাটন অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, মাদকের ডিমান্ড বা চাহিদা বন্ধ করিয়া। এর জন্য প্রশাসনের মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। প্রয়োজন পাড়ায় ও মহল্লায় মাদক প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা। ইহার সহিত মাদকের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণে ঐ তথাকথিত প্রভাবশালীদের নিবৃত করিতে হইবে। ইহার জন্য অবশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন রহিয়াছে।