বাঙালি সত্তা নানাস্তরে পৃথককৃত। যুগ যুগ ধরে মানুষ তার আপন সাধনায় যে সভ্যতা গড়েছে তার মধ্যে সাহিত্য শিল্প সংবেদনশীল অনুভূতির অপরাজেয় জীবনাদর্শের প্রতীক হয়ে আছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যধারারও পরিবর্তন ঘটেছে। আর সেই ধারাবাহিকতায় অসাধারণ পাণ্ডিত্য, সুনিপুণ বিশ্লেষণী শক্তির সঙ্গে গণমুক্তির চেতনা ও বাস্তব অনুষঙ্গ এক অনন্যসাধারণত্ব দান করেছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্কর, ওয়ালীউল্লাহর পথপরিক্রমায় তিনিও তাঁর স্বরায়তন গড়ে তোলেন ১৯৬০-এর দশকের দিকে। রাজনৈতিক পটভূমিতে যাঁর সাহিত্যের উপজীব্য হয়েছে সমষ্টিগত পর্যায়ের মানুষদের জীবন এবং অনাহার, অভাব, দারিদ্র্য ও শোষণের শিকার হয়ে যারা বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, মানবেতর জীবনযাপন করছে—সেসব অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অবিভক্ত বাংলার রংপুরে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বগুড়ার উপকণ্ঠে করতোয়ার তীরে নারুলি গ্রামে। বাংলা ভাষা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন তিনি। দুই বাংলায় ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের লেখক হিসেবে তাঁর বড়ো পরিচয়। ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’, ‘খোঁয়ারি’, ‘দুধভাতে উত্পাত’, ‘দোজখের ওম’, ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’—এই পাঁচটি তাঁর অনন্য গল্পগ্রন্থ। একমাত্র প্রবন্ধ সংকলন ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’। স্বল্প সৃষ্টির মধ্যেই তিনি সময়ের বৃত্তবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের সম্পূর্ণতা অর্জনের নতুন আলোর অনলস চেষ্টায় বিস্ময়কর এক শিল্পবিশ্ব সৃষ্টি করতে পেরেছেন। অসময়ে পৃথিবী থেকে বিদায় না নিলে হয়তো আরো অনেক কিছু অক্ষয় সম্পদ লাভ করতে পারতাম আমরা যা সমাজতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বাস্তবতায় লেখকের গভীর জীবনবোধ, যুগপত্ ব্যাপ্তি ও গভীরতার শিল্প-দর্শন হয়ে রং ছড়াত দুই বাংলা ছাড়িয়ে প্রাচ্যের নীলিমায়। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ‘significant’ শিল্পী। উপন্যাসের সৃষ্টিতে তিনি ভায়োলেন্ট আবেদন খুব পছন্দ করতেন।
তিনি নিজেই বলেছেন :‘উপন্যাসে অনেক চরিত্র থাকে এবং কল্পনা থাকে অসাধারণ। এইজন্য শত্রুপক্ষ, যারা উপনিবেশবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, তারা কিন্তু উপন্যাসকে ভয় পায়।... ডন কিহোতে যখন লেখা হয়, তখন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে সেটা ব্যান করা হয়, কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। ডন কিহোতের মধ্যে অসাধারণ ম্যাজিক ছিল না। তো তখন ডন কিহোতের ম্যানুস্ক্রিপ্ট এবং কিছু ছাপা বই স্মাগলড হয়ে ল্যাটিন আমেরিকায় গেল। তাহলে প্রক্রিয়াটা এখনো অব্যাহত রয়েই গেছে, বাধা দেওয়ার প্রক্রিয়াটা।’ ফলে সব বাধাকে উপেক্ষা করে কথাসাহিত্যিক ইলিয়াস সচেতনতার সাথে চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যা সামাজিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সংগ্রামের প্রশ্নে সামূহিক চেতনায় অভিব্যক্ত। বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে প্রেমের ও সংগ্রামের, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক অস্তিত্ব রূপায়ণে তিনি নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজ মানুষের ধূসর গোধূলি জীবনযুদ্ধের চিত্র তুলে ধরেন। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’—এই দুটি উপন্যাসেই ইলিয়াস নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের নিঃসঙ্গ জীবনের প্রকৃতি নির্মাণ করেন। তিনি নিজেই বলেছেন : “আজ মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু যে-মধ্যবিত্ত আজ তাদের ‘মুক্তির জন্য স্থিরসংকল্প’, তাদের ‘শ্রমজীবী নিম্নবিত্তের সঙ্গে যোগাযোগ’ রাখতে হবে।”
যান্ত্রিক সভ্যতার চাপে মানুষের জীবনে এসেছে শূন্যতা, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা। রুশো সমাজে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা একাকীত্ববোধ থেকে এক মর্মান্তিক শূন্যতাবোধের চিত্র অঙ্কন করেছেন। সার্ত্র দেখিয়েছেন, মানব অস্তিত্বের সংকট কীভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে তা রূপান্তরিত হয় নৈঃসঙ্গ্যচেতনায়। ফলে মানবসত্তা হয় প্রবলভাবে বিপন্ন বিধবস্ত। সার্ত্রের ভাষায় : ‘...in the shock which seizes me when I apprehend the others look, this happens - that suddenly I experience a subtle alienation of all my possibilities which are now associated with objects of the world.’
বস্তুত ইলিয়াসের সাহিত্যের উপন্যাস এবং ছোটগল্পে বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ এই সন্ধানের বহুমাত্রিক বিচ্ছুরণ রয়েছে যা তাদের জীবনের আলাদা আলাদা স্তরে দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ আর টানাপোড়েন-সংঘর্ষ-সংশ্লেষণ। ফলে শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন, বিভ্রান্তি, উদ্যোগ ও ব্যর্থতা, ক্রুরতা ও চক্রান্ত কৌশল, নিঃসৃত বোধ নিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন। ছিন্নমূল ওসমান আর হতাশায় নিমজ্জিত আনোয়ার একক ব্যক্তিসত্তা নয়; বাস্তবতার নানা অন্তঃস্পন্দনে ঋদ্ধ হয়ে এরা সামূহিক ব্যক্তিসত্তার চিহ্নায়ক। হাড্ডি খিজির যখন মারা যায়, তখন সন্ন্যাসী বিদ্রোহে যারা নিহত হয়েছিল তারা আসে, অন্যান্য বিদ্রোহে যারা নিহত হয় তারাও আসে। হাড্ডি খিজিরের মতো সর্বহারার ইশারায়, প্রকল্পনার আবহ হলেও অনেকেই যোগ দিতে পারে তা সত্যিই অনন্য।
ইলিয়াস সচেতনতার পাশাপাশি নতুন সংহিতার জন্ম দিয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যের সব পাতায়। তাঁর লেখায় আচ্ছন্ন ইতিহাস, কুহক ও সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতা যা উপন্যাসের ভাষা মিশে যায় পরাভাষার সঙ্গে। কলিন ফ্যাল্ক যথার্থই লিখেছেন : ‘imaginative literature is our mostmost fundamental mode of transportation of reality.’
প্রকৃতপক্ষে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর সাহিত্যসাধনায় গভীর জীবনবোধ, সমাজচেতনা, শ্রেণিচেতনার জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলেন। সৃজনাত্মক প্রয়োগ, অন্তর্নিহিত সত্তার সমাপ্তি শূন্যতায় স্বাধীনতার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা বৃহত্তর আন্দোলন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, আসামের ভূমিকম্প, তেভাগা আন্দোলন, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক উপাদান মনঃস্তত্বমূলক বাস্তবতা এনে দিয়েছে তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্পে। তাই ইলিয়াসের লেখায়, সাহিত্য সন্দর্ভের মর্মমূলে যুগপত্ ব্যাপ্তি, প্রগাঢ় কাব্যিক অনুভূতি সহজেই আলো ফেলে মহাসময়ের সঙ্গে খণ্ডকালের দ্বিবাচনিকতায়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যুগমানস কথাশিল্পী। তাঁর সূক্ষ্ম সংবেদনশীল অনুভূতি ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ নির্মাণে পৌর সমাজ ও রাজনৈতিক সমাজের মৈত্রীসূত্রকে চিনিয়ে দেয়। তাঁর সাহিত্যবিশ্ব এই সন্ধানে সমুদ্রের মগ্নশিলার ঈষত্ বহিরস্তিত্বের মতো ক্রমপরাক্রমশালী। তাঁর সাহিত্য, সব সৃষ্টি বড়ো শিল্প হয়ে উঠেছে illusion of Reality-এর পরস্ফুিটনে। এই প্রসঙ্গে মপাসাঁর উক্তি স্মরণীয় :
‘The Realist if he is an artist will seek to give us not a banal photographic representation of life, but a vision of it that is fuller, more vivid and more compellingly truthful than even reality itself.’
বর্তমান জীবনের বিশ্বস্ত গভীর প্রকাশ কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনা, সাহিত্য তত্ত্ব ও তথ্যের সত্যতায় অনন্য শিল্পভাষ্য। সংবেদনশীল অনুভূতি, ব্যাকুলতা ও ধ্যানকল্পনা ইলিয়াসের ভাষায় অপূর্ব শরতের রং পেয়েছে, কোথাও কোথাও তা ব্যঞ্জনাময় মিস্টিক কবিতার মতো। সেজন্যই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যা কিছু সৃষ্টি করে গেছেন, জীবন থেকে মুঠোয় ভরে নিয়েছেন, তা-ই গলে যাওয়া সোনার হেম হয়ে গেছে। পিকাসোর ভাষায় : ‘Everything that I touch comes to life and becomes the incarnation of some aspect of my internal drama.’