জহর সেনমজুমদার
ভূমি ও ভৌগোলিকে নয়, দু বাংলা যখন প্রবহমান চেতনাসংলগ্ন হয়ে ওঠে সেতুসম্পৃক্ত সৃষ্টির কথা বলে—তখন সেই নীরব ও নিভৃত পারাপারের মধ্যে কবি শামীম রেজার ধ্যানস্থ কবিতায় চড়ুই কিংবা শালিকের মতো প্রবেশ ক্রমশ অনিবার্য হয়ে ওঠে; ভূমি ভূমা ভাষা ও হূদয়লিপি দিয়ে সে টানে, নদী নারী মাটি ও সমপ্রাণতা দিয়ে সে টানে, ঐতিহ্য ভূগোল ইতিহাস ও শিল্পিত খোদাই দিয়ে সে টানে—টানতে টানতে আমাদের চারপাশের বিষাদ ও বিদ্যুতের ব্যবহূত ডানা থেকে একে একে খসে পড়ে পাণ্ডুলিপি ভর্তি পাখি এবং চিত্রকল্প ভর্তি আশ্চর্য আলো-আবছায়া; যেন কবিতা নয়—ব্যবহূত শব্দের উদ্ভাসনে এবং প্রায়োগিক চিত্রকল্পের ভাসমানতায় মনে হয়—মনে হয়ে থাকে একজন বিষণ্ন মানুষ যেন লোকায়ত স্মৃতি খুঁজছে—একজন বিপন্ন মানুষ যেন লোকায়ত শিকড় খুঁজছে—একজন বিধ্বস্ত মানুষ যেন নারী ও নাড়ির ভেতর একা একা ঢুকে পড়ে বারবার বাংলার জমিন খুঁজছে—সত্যি বলতে কি কবি ব্যবহূত কবিতার খাতা যে একটা সামগ্রিক জীবনযাপনের অখণ্ড দলিল হতে পারে, একটা তিন ফসলা জমির উত্পন্ন কৃষিচেতনা হতে পারে—শামীমের কবিতা পড়লেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়; এও বোঝা যায়—তিনি মানবজমিন আবাদ করতে এসেছেন, কর্ষণ করতে এসেছেন, আর লোকায়ত সেই কর্ষণের দ্বারাই তিনি একটানা কাল থেকে আজও ক্রমাগত উদাস ও উদ্দীপ্ত ভূমিস্বর্গ প্রতিস্থাপনের কবিতাই লিখে চলেছেন...
এক.
আসলে সব অর্থেই কবিতাকে হূদয়সম্পৃক্ত বেদনাঘোর এবং জীবনসম্পৃক্ত চেতনাঘোর দিয়েই রচনা করতে হয়—তাহলেই একজন ব্যথিত কবি সহজেই পারেন—কীর্তনিয়া নদীর ভেতর নিজের দুটি উত্সুক চক্ষু রেখে আসতে, নিশিজাগা দুরন্ত পাখির সঙ্গে ডানা মেলে আকাশে ভাসতে, জলফড়িঙের ঘরে ঢুকে হাত বাড়িয়ে পটচিত্র আঁকতে, হূদয়ের কারুকাজ দিয়ে বাঙালিকুমারীর নীলডুমুর সংশ্লেষে ছুঁয়ে দিতে, কিংবা সবুজ দ্বীপের ভেতর মাটির বাঁশি বাজাতে বাজাতে ক্রমে সহজিয়া রাখাল অথবা রাখালিয়া সহজ হয়ে উঠতে—বলতে দ্বিধা নেই সহজ হয়ে উঠবার সহজ সাধনাই তো আমাদের জীবন থেকে নষ্টভ্রষ্ট আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে; পচা চালুকমড়ার ছাঁচের মতো এই নাগরিক আধুনিকতা এই অবক্ষয়ী আধুনিকতা এই কুহক অঞ্জলির আধুনিকতা ভেতরে ভেতরে কতখানি যে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের আত্মা ও ভূমণ্ডল—তা বুঝতে তা অনুভব করতে কত সময় আর লাগবে আমাদের? সত্যি বলতে :
—এই আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে চর জাগা নদী
—এই আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে চেনা ডাহুকের মৃত্যু
—এই আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে হাড়ভাঙ্গা কুয়াশা আশ্রম
—এই আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে কবুতরের ছটফটানি
—এই আধুনিতা আমাদের দিয়েছে উত্সবহীন মাটির কান্না
কোথায় গেল সেই অবিনাশী নালন্দার মেয়ে? যার ভেতর রয়ে গেছে চিরকালের অবিনাশী বীজ; কোথায় গেল সেই সুবর্ণনগর? যার ভেতর রয়ে গেছে রুপালি ইলিশের বিকাল ও তার স্বপ্নের বিছানা; শামীম জানেন, তার কবিতাসত্তা বোঝে—মানুষ কোনো অন্ধকার তামসিক আস্তাবল চায় না—চায় মাটি থেকে উঠে আসা একটা প্রত্যয়প্রদীপ্ত ঠিকানা; যেভাবে পাখি জন্ম হয়, যেভাবে ফুলজন্ম হয়—শামীম সেইদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলমান নদীর দু পাশে একটার পর একটা ‘ঘর’ বসাতে থাকেন, একটার পর একটা ‘পাখি’ বসাতে থাকেন আর ক্রমে ক্রমে এই অভিশপ্ত আধুনিক খাঁচাজীবন ভেঙে বার হয়ে আসতে আসতে লিখতে শুরু করেন কোনো এক মায়াহরিণীর রূপকথা, গার্গীবাংলার ও রোকেয়াবাংলার রূপকথা—বাংলার পলির ওপর সেফটিপিন দিয়ে কবিতা লিখতে পেরেছেন শামীম, আর পেরেছেন বলেই তাঁর কবিতায় আমরা তুমুলভাবে পাই সন্ত্রাসকবলিত মানবীয় আত্মার আর্তনাদ, অন্ধকারকবলিত ঢেউ ও তরঙ্গের ওঠা-পড়া কিংবা ওঠা-নামা; ফলত এভাবেই শকুনের মখমল ছিঁড়ে মা ও মাটির ‘কান্নারেণু’ সংগ্রহ করেন তিনি; ফলত এভাবেই ঘুঘুডাঙার ঘুঘুশিকারিদের প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ করতে করতে তিনি একটা লোকাল স্টেশনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়েন, আর চোখ ভাসিয়ে এবং মন উড়িয়ে দেখতে থাকেন তাঁর নিজস্ব ‘স্বপ্নভূম’, তাঁর নিজস্ব ‘স্বপ্নবিছানা’, তাঁর নিজস্ব ‘বধূয়া’ এবং সর্বোপরি ‘সান্ধ্যপাখির দাওয়া’—এই দাওয়ায় তিনি একই সঙ্গে কবি ও কাব্যাচার্য, কৃষক এবং সাধক, প্রত্নযুগের হারানো অক্ষর নিজের সর্বাঙ্গে গেঁথে বসে আছেন—আর তাঁকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটা ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল, যেখানে পড়তে আসে কোনো এক প্রবালদ্বীপের পূণির্মাপাখি—আর ঠিক তখন, বঙ্গদেশ কথা বলে বাংলাভাষায়—বঙ্গদেশ গান গায় বাংলাভাষায়—আর শিকারি তৈরি ফাঁসিকাঠ ভেঙে পড়েতে থাকে, চারপাশে খুব দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে...
দুই.
শামীমের কবিতা, যেন এলিয়টের ধ্বংসস্তূপের ওপর হুইটম্যানের সবুজভূমি স্থাপন, সবুজভূমি প্রতিস্থাপন; একদিন রবীন্দ্রনাথ তিরিশের ইউরোপ-কেন্দ্রিক কবিতাচর্চার শিকড়চ্যুত মোহকে যেভাবে প্রতিহত করতে চেয়ে পাঁকের কবিতা, পোকার কবিতা কিংবা প্রলাপের কবিতা বলে তিরস্কৃত করেছিলেন—নব্য আধুনিকাতাবাদ তাকে কি ভুল বোঝেনি? অবশ্যই বুঝেছিল; এবং ভুল বুঝেছিল বলেই পরবর্তী বাংলা কবিতা কিছু নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমীদের বাদ দিয়ে ক্রমশই ঢলে পড়েছিল সেই মহত্ রবীন্দ্রকথিত পাঁকের দিকেই, পোকার দিকেই, প্রলাপের দিকেই; ফলত সেই চাপা দীর্ঘশ্বাস থেকেই হয়তো শামীমের মতো কেউ কেউ খুব দ্রুত ফিরে আসছেন, সৌভাগ্যবশত ফিরে আসছেন—হারানো মাটির দিকে, অপহূত নদীর দিকে, থ্যাঁতলানো শিকড়ের দিকে; মধ্যরাতে উটের ছায়া নিয়ে যে বেশিদূর যাওয়া যায় না এবং সম্ভবও নয়—এই সত্য অতিরিক্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে বুঝে নিয়েছেন অতিদ্রুত কবি শামীম; কবিতার শামীম; তাই কি স্বচ্ছন্দে ও সহজে অন্ধকার পটভূমির ভেতর তিনি রোপন করেন :
—সন্ধ্যাতারা ও শ্রীমন্ত নদী
—কৃষ্ণবাঁশি ও কুমারীপাহাড়
—চৈত্রসংক্রান্তি ও উজ্জয়িনী
—টুনটুনি পাখি ও তাঁতিদের গাঁও
—দাদিমার ঝুলি ও রূপকথার জোছনা
—যজ্ঞডুমুর ও আদিবাসী ওম
—স্বপ্নিল বীজ ও হাওড়ের ঢেউ
—আদর্শলিপি ও কলাবতী পাড়
ঔপনিবেশিক মুখোশের ঢেউ সরাতে সরাতে শামীম এভাবেই মৃত অমরা থেকে তাঁর বুকভর্তি গাঢ় শোক নিয়ে উঠে আসেন দেশ মাটি জীবনের পরানকথায়; উঠে আসেন শৈশবের বীজ ছড়াতে ছড়তে, বাল্যকালের প্রেমিকের মতো; হাতে তাঁর ‘মরা ধানক্ষেত’ ও ‘কুয়াশা-আশ্রম’; মূলত এই মরা ধানখেতেই তিনি জৈব জীবনের উত্সব ও উদ্দীপনা নতুন করে জাগিয়ে তুলতে চান; মূলত এই কুয়াশা-আশ্রম তছনছ করে দিয়েই তিনি ‘পাখিহীন বাবুই-বাসার’ ভেতর পুনরায় ফিরিয়ে আনতে চান তাঁর বংশবিস্তারের অনন্ত বাংলা, যা পড়তে পড়তে এবং দেখতে দেখতে আমরাও স্পষ্ট বুঝতে পারি—তিনি তাঁর চারপাশের এই নকল নগর ভেঙে শুধু একটা অপরূপ ‘গেঁয়ো পথ’ ধরে হেঁটে হেঁটে উপনিবেশ ও তার যান্ত্রিক চক্রব্যুহের যাবতীয় নখদাঁত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দিতেই বেশি উন্মুখ, বেশি আগ্রহী, বাংলার নিভৃত জলে তো সবাই স্নান করতে পারে না, সবাই স্নান করতে জানে না, শামীমের কবিতা সেক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠে সাঁতার শেখানোর কবিতা—সাঁতার প্রতিষ্ঠার কবিতা—সাঁতার বিস্তারের কবিতা...
তিন.
জলপদ্ম ও নালন্দা, নীলাচল ও দুয়োরানি—একটা নিরুদ্দেশ ছায়াপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ও খুঁজতে খুঁজতে শামীমের কবিতা যখন পুরাণবাংলার পুরোনো স্মৃতিতে চলে যায়—তখন সে অতীত; আর মৃতদের পোয়াতি পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে এবং কাঁদতে কাঁদতে যখনই সে পা রাখে রক্তহ্রেষা আর্তনাদের ইহবাস্তবে—তখন সে এক আশ্চর্য বর্তমান, অপ্রতিরোধ্য বেহালাবাদক, কিংবা, দুনির্বার সৃজনকারিগর—নাগরিক মলমূত্র থুতুর ভেতর পরম প্রত্যয়ে ক্রমাগত গড়ে তুলতে থাকে একটা সামগ্রিক কাজলা দিদির বাগান; বস্তুতপক্ষে শামীমের অন্তর্গত চেতনাপ্রবাহ এতই সত্য এতই খাঁটি যে সলতে জ্বলা এই বাংলার রূপকথা ও পরানকথার মৃত্যু নেই কোনো; এই ‘সলতে’ জ্বালিয়েই সে দুই বেহালাবৃক্ষের মাঝখানে অন্ধ বেহালাবাদকের রূপকসত্তা বা প্রতীকসত্তা নিয়ে চিরকাল যেন দাঁড়িয়েই আছে—সে জানে—রাত্রি ফুরায় কিন্তু জীবন ফুরায় না; সে জানে—গোলকধাঁধা শেষ হয় কিন্তু কাজলরেখা কিংবা চাঁদের বুড়ি কিংবা হাস্নাহেনার জোনাকি কখনো কোনোদিন এই ব্রহ্মমণ্ডলে শেষ হয় না... এতখানি বিশ্বাস তার... গাঢ় ও প্রগাঢ় বিশ্বাস—এই বিশ্বাসেই তিনি বাংলার মাটিতে হাতে খড়ি দেন—এই বিশ্বাসেই তিনি তাঁর যাবতীয় জীবনযন্ত্রণাজাত দুঃখ বাংলার মাটিতে গেঁথে রাখেন আর শরীর পালটে পালটে ইন্দ্রিয় পালটাতে পালটাতে ফিরে আসেন বারবার গুঞ্জারমালার আদুরে জ্যোত্স্নায়; তারপর? তারপর লেখেন সেই অমর পঙিক্ত :
—বাঁইকা যাওয়া বীজ থেইকা উত্থিত স্বপ্নিল বীজ আমি—
বাংলা কবিতা এই স্বপ্নিল বীজ নিয়েই চতুর্দিক প্রসারিত দিগন্ত জুড়ে খুলে দিচ্ছে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই আত্মআপন চিরকালীন ভূমিস্বর্গেরই দরজা; জানলা; মায়াময় স্মৃতিমেদুরতা... আর এই স্মৃতিমেদুরতা তাঁর নিমগ্ন চৈতন্যে এমনভাবে মিশে আছে, সেও এক তীব্র বিস্ময়—সেও এক বাঙ্ময় আত্মকথন—যা জীবন এবং ইতিহাসকে একই সঙ্গে জুড়ে দিতে দিতে ক্রমশই এগিয়ে চলেছে গাছ ও নদীর, বীজ ও মানুষের কথোপকথনের দিকেই...