n শফিকুর রহমান রয়েল
জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যানুসারে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে পৃথিবীতে পর্যটক উপস্থিতি কমেছে ৭৪ শতাংশ। করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত এবং সহসাই করোনা-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নাই বললেই চলে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনেক উন্নয়নশীল দেশ এবং পশ্চিম গোলার্ধ-বিশেষত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পর্যটন খাত করোনার নেতিবাচক প্রভাবে একেবারে কাবু হয়ে পড়েছে। মহামারি শুরুর আগে পর্যটন ছিল বড় ব্যবসা; বৈশ্বিক জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১০ শতাংশেরও বেশি। আর পর্যটননির্ভর দেশগুলোয় হিস্যা ছিল আরো অনেক বেশি। এ খাতের পরিত্রাণের জন্য ব্যাপক হারে ভ্যাকসিন বিতরণ ও প্রয়োগ এবং নতুন নীতির বাস্তবায়ন অপরিহার্য। অন্যথায় আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
কিছু সরকার এরই মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা করতে শুরু করেছে; সরাসরি কিংবা নামমাত্র সুদে। পর্যটন শিল্পকে নিশ্চয়তা প্রদানই তাদের মূল লক্ষ্য। থাইল্যান্ড তাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টস্বরূপ বরাদ্দ করেছে ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) সমপরিমাণ থাই বাথ। ভানুয়াতু তাদের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে অনুদান নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। অনেক দেশ আবার তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাবসায়িক কৌশলসমূহকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহযোগিতার পাশাপাশি কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্র জ্যামাইকার চেষ্টাটা আরো বড়। তারা তাদের ১০ হাজার পর্যটন শ্রমিককে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনামূল্যে অনলাইনে ক্লাস করাচ্ছে। সব ক্লাস শেষে আবার সার্টিফিকেট প্রদানেরও বন্দোবস্ত করেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য পর্যটন-নির্ভর সব দেশের সরকারের আন্তরিকতায় সঙ্গতকারণেই তারতম্য রয়েছে। পর্যটন খাতকে পুনোদ্দীপ্ত করতে সহযোগিতার বিকল্প নেই জানা সত্ত্বেও তারা তা করতে পারছে না সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের কারণে। যে কারণে ভিন্ন কৌশল বেছে নিয়েছে কিছু দেশ, যেমন কোস্টারিকা। দেশটি অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে উত্সাহিত করতে অস্থায়ীভাবে সাপ্তাহিক ছুটিকে নিয়ে গেছে সোমবার পর্যন্ত। সপ্তাহান্তের পরিসর বাড়ানোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয়রা যেন শান্তিতে ছুটি কাটানোর জন্য ভ্রমণকেই বেছে নেয়।
নতুন কৌশল হিসেবে বার্বাডোস চালু করেছে ‘ওয়েলকাম স্ট্যাম্প’ ভিসা। এতে সেখানে এক বছর থাকার পাশাপাশি কাজ করারও অনুমোদন দেওয়া থাকে। ফিজির কৌশলটা অবশ্য একটু ভিন্ন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নীল গতিপথ’। কঠোর কোয়ারেন্টাইন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইয়টগুলোকে তাদের পোতাশ্রয়ে নোঙ্গর ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রাদুর্ভাব-পরবর্তী সময়ে ইকোটুরিজমকে লক্ষ্য রেখে পরিবর্তনকে সবসময়ই চলমান রাখতে হবে। দ্রুত বর্ধিষ্ণু এ শিল্পে দৃষ্টিনিবদ্ধ রাখা হয় সংরক্ষণ ও স্থানীয়দের চাকরি সৃষ্টিতে। এটি ইতিমধ্যে কোস্টারিকার পর্যটন কৌশলের অনুপ্রেরণায় মূল উপাদান হয়ে উঠেছে। অভিযান ভ্রমণ এবং স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সফরসহ যথোপযুক্ত বাজারে রূপান্তরিত হওয়ার প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড।
পর্যটন বিকাশে প্রযুক্তিও পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অদূরভবিষ্যত্ পর্যন্ত এখনকার মতো সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত রীতিনীতি বহাল রাখার প্রয়োজন পড়বে। স্পর্শহীন সেবা সরবরাহ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সেতুর ভূমিকায় অবতীর্ন হতে পারে। ভ্রমণ হ্রাস হয়তো বেশি দিন থাকবে না; কিন্তু অতিরিক্ত পর্যটন-নির্ভরতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ভীতির সংশ্লিষ্ট থেকেই যায়। পর্যটন-নির্ভর কিছু দেশকে তাদের অর্থনীতির বহুমুখীকরণে দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। পর্যটন-বহির্ভূত খাতগুলোয় বিনিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, কিন্তু পর্যটন ও স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও বিনোদনের মধ্যে সংযোগগুলো শক্তিশালী করে এটি সহায়তা লাভ করতে পারে। সীমিত অর্থনৈতিক পরিসর দ্বারা আরোপিত প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে আঞ্চলিক চুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা খাতসহ রপ্তানি প্রসারিত হতে পারে।
পর্যটন খাতের সমাধানের উপায় দেশভেদে ভিন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক এবং পুনরুদ্ধারের গতি ও পরিধি অবশ্যই বৈশ্বিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কাজে লাগানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ রয়েছে। প্রাদুর্ভাবের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অন্তর্বর্তী অগ্রাধিকারের বাইরে সব দেশেরই প্রয়োজন হবে পর্যটন শিল্পের জন্য একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থা নির্ধারণ করা এবং তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। বহুমুখীকরণ, অধিক টেকসই পর্যটন মডেলে রূপান্তর এবং নতুন প্রযুক্তিসমূহে বিনিয়োগ আগের অবস্থা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। এটি না মেনে উপায় নেই।
—আইএমএফ নিউজ অনুসরণে