নিয়মের বাঁধন আস্তে আস্তে শক্ত হইতেছে

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, এই সকল প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সূত্র ধরিয়াই উচ্চশিক্ষার্থে শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাইবার হার তুলনামূলক কমিয়া আসিয়াছে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অংশ যদি দিনের পর দিন আইন অমান্য করিয়া চলে এবং বিশ্বমানের শিক্ষাকার্যক্রম হইতে শত যোজন পথ দূরে থাকে, তবে তাহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। ইহা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলা ছাড়া আর কিছু নহে। সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ নামের যেই আইনের আলোকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হইতেছে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই এই আইন অমান্য করিতেছে। অভিযোগ রহিয়াছে, কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা না করিয়াই অনেকে সনদ পাইয়া যাইতেছেন। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠান হইতে ২৮ জন কর্মকর্তার সনদ যাচাইয়ের জন্য গলদঘর্ম হইতে হইয়াছে ইউজিসিকে। এই কারণে এইবার নূতন ভর্তিকৃতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর তথ্য ইউজিসিতে পাঠাইতে নির্দেশনা দেওয়া হইতেছে, যাহাতে শিক্ষার্থী ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের কি না এবং যথানিয়মে কোর্স সম্পন্ন করিতেছেন কি না, তাহার প্রমাণ ইউজিসির নিকট থাকে।

আমরা লক্ষ করিয়াছি, বাংলাদেশের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই কারণে আইনের প্রতি উদাসীন যে, আইন না মানিলেও বিশেষ কিছু হয় না। এই সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন না মানার প্রবণতা এমন পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে যে, সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নামক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ভাবমূর্তি। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই তো অনিয়মের বেসাতি নহে। আমরা স্পষ্ট করিয়াই বলিতে চাই, দেশের বেশ কিছু অত্যন্ত মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা জাতীয় উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখিয়া চলিতেছেন। কিন্তু যাহারা মান এবং আইনের তোয়াক্কা করিতেছেন না, তাহাদের জন্য সমগ্র খাতটিই বদনামের শিকার হইতেছে। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ শুরু হয় ১৯৯২ সাল হইতে। অন্যান্য দেশে যেমনটি ঘটিয়াছিল, আমাদের দেশেও ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গজাইয়া উঠে। অভিযোগ আছে যে, মূলত অর্থ রোজগারের লক্ষ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হইতেছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে হইতে হইবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। দেশে বর্তমানে ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রহিয়াছে। এইগুলির মধ্যে বর্তমানে চালু রহিয়াছে ৯৮টি। মনে রাখিতে হইবে, যেই সকল কারণে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটিয়াছিল সেইগুলির মধ্যে প্রধান দুইটি কারণ হইল—উচ্চশিক্ষার বর্ধিত চাহিদা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পক্ষে মিটানো সম্ভব হইতেছিল না এবং সরকারি তহবিলের অভাব অর্থাত্ দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদা পূরণে যেই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, সরকারের পক্ষে বাজেটে সেই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব না হওয়া।

আসলে, খারাপ মানের বিশ্ববিদ্যালয় সারা বিশ্বেই রহিয়াছে। এমনকি উচ্চশিক্ষার স্বর্গভূমি আমেরিকাতেও অনেক ভুঁইফোঁড় বিশ্ববিদ্যালয় রহিয়াছে। এই জন্য ভর্তির আগেই শিক্ষার্থী ও তাহাদের অভিভাবকদের ভর্তি হইতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং, শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে ভালোভাবে জানিয়া লওয়া বিশেষ প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী গাঁটের পয়সা খরচ করিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিবেন, অথচ ঐ প্রতিষ্ঠানের মানের বিষয়টি খোঁজখবর লইবার মতো জ্ঞান বা বুদ্ধি তাহার থাকিবে না—এমন নির্বুদ্ধিতার মাশুল তাহাকে তো দিতেই হইবে। তাহারা তো অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা অশিক্ষিত নহেন। সুতরাং সর্বাগ্রে নিজেদের সচেতন হইতে হইবে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হইতে হইবে। কারণ ঐ আইনের উপর ভর করিয়াই তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনার বৈধতা পাইয়াছেন। আইন তো কাজির গরু নহে যে কেবল কাগজে থাকিবে। ইহা মানিতেই হইবে। তবে আমরা ঔপনিবেশিক অরাজকতার উত্তরাধিকার বহন করিয়াছি বিধায় আইন মানিবার প্রবণতা একটু ধীরে ধীরে আমাদের মগজে প্রোথিত হইতেছে। নিয়মের বাঁধন আস্তে আস্তে শক্ত হইতেছে। ইহার জন্য ধৈর্য ধরিতে হইবে বটে। অস্থির হইবার কিছু নাই। সময়ই সকল কিছু ঠিক করিয়া দিবে।