খাদ্যনিরাপত্তায় স্থবিরতা কাটাতে করণীয়

সাম্প্রতিক কালে কৃষিতে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে এবং ‘খাদ্যে ৭৪ লাখ টন ঘাটতির শঙ্কা’—এই শিরোনামে গণমাধ্যমের খবরে এসেছে, যেখানে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাকে তুলে ধরা হয়েছে। তাই অর্থনীতিবিদগণ বলছেন  বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতি ও অন্যান্য বিষয় আমলে নিয়ে ভবিষ্যত্ খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে কৃষির স্থবিরতা কাটানো জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীনতার  ৫০ বছরে  মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি  আর খাদ্যশস্য উত্পাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব বলছে, খাদ্যশস্যের উত্পাদন যখন গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পায়, তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে—এ তত্ত্বকে  ভুল প্রমাণিত করেছে বাংলাদেশ। বাংলার কৃষকরা এখানেই থেমে যাননি যারা একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও  উদাহরণ তৈরি করেছে। কৃষি উত্পাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করেছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধির হার ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। বিবিএস ও বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত এক দশকে চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যে উত্পাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। চাল বাদে অন্যান্য কৃষিপণ্য, যথা—ফল, ফুল, মসলা, আঁশজাতীয় খাদ্য, ডাল, ভুট্টা, আলু, সবজি ও তেলজাতীয় খাদ্যে  বৃদ্ধি হলেও  গত এক দশকে চাল উত্পাদন বেড়েছে ৩০ শতাংশ। স্বাধীনতার পর গত চার দশকের কিছুটা বেশি সময়ে আমাদের চাল উত্পাদনের পরিমাণ তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে ৩ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। দেশে প্রধান খাদ্য চাল উত্পাদনে বড় বিষয় হলো প্রবৃদ্ধি হারে ধারাবাহিকতার অভাব।

এক বছর প্রবৃদ্ধির হার ধনাত্মক হলে পরের বছর প্রবৃদ্ধির হার হয় নিম্নমুখী, না-হয় শূন্য বা ঋণাত্মক। গত এক দশকের সরকারি তথ্য এর সত্যতা প্রমাণ করে। প্রধানমন্ত্রী  গত ২৭শে  ফেব্রুয়ারি  এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন বাংলাদেশ সম্প্রতি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে, যা সমগ্র জাতির জন্য এটা  আনন্দের ও গর্বের, যা এমন একসময়ে ঘটল যখন  সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন তথা  মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের দ্বারপ্রান্তে আমরা রয়েছি। আজকের যে অর্জন তা সরকারের বিগত ১২ বছরের নিরলস পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফসল। এ ছাড়াও বিগত ১২ বছরে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে উন্নয়নগুলো করেছে, তার মধ্যে রয়েছে জিডিপির আকার বর্তমানে ৩৩ হাজার কোটি টাকা, সরকারি ব্যয় ৪.৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, দারিদ্র্যের হার কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ এবং হতদরিদ্রের হার ১০. ৫ শতাংশে, দানাদার খাদ্যশস্য উত্পাদনের পরিমাণ ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার টন, ধান উত্পাদনে তৃতীয়, মাছ-মাংস, ডিম, শাকসবজি উত্পাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উত্পাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে, ইলিশ উত্পাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম ।

বিশ্বব্যাপী  নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের  কারণে এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালনের তাত্পর্য অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের (২০২০) বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যে খাদ্য উত্পাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় খাদ্যনীতিতে খাদ্যনিরাপত্তায় চিহ্নিত তিনটি নিয়ামক হলো খাদ্যের সহজলভ্যতা, খাদ্যপ্রাপ্তির সক্ষমতা এবং খাদ্যের জৈবিক ব্যবহার। এখানে উল্লেখ্য, প্রথমত চাল উত্পাদন  পরিমাণ  মূলত সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বর্তমানে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চালকল মালিকরা ধানের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বোরো ধান কাটার মৌসুম শেষে চালকল মালিক, ব্যবসায়ী, বড় ও মাঝারি কৃষকের কাছে ধানের মজুত দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮ .৯, ১৮.৫ এবং ২৯.১ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট আইনের আশ্রয় নিয়ে ব্যবসায়ী ও বড় কৃষকদের মজুত ধান বাজারে বিক্রিতে বাধ্য করা গেলে বাজারে ধান সরবরাহ বেড়ে যাবে এবং চালের দাম কমবে। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি হলো ২০১৮ সালে প্রণীত কৃষিনীতির নতুন সংযোজন হলো ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার যা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত নয়। এটা হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম ব্যবহার, যা পদার্থকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে রূপান্তরের পর তা নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এই প্রযুক্তি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানকে সমন্বয় করে এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যা ব্যবহূত হয় ওষুধ তৈরি, রোগ শনাক্তকরণ, শিল্প ও কৃষি উপকরণ তৈরিতে। বিশেষত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক উত্পাদনে, মাটির গুণগত বৃদ্ধি পানি পরিশোধনে, কৌলিতত্ত্ব প্রজনন ও শনাক্তকরণে। এ বিষয়ে ভারতে ব্যাপক গবেষণা চলছে এবং বাংলাদেশে এর নতুন সংযোজন সূচনা হয়েছে, যা একটি শুভ লক্ষণ মাত্রা—প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলের রোগ নির্ণয়, জাতিভিত্তিক পুষ্টি চাহিদা নির্ণয়, পুষ্টি আহরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ, বালাইনাশক উদ্ভাবন ইত্যাদিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তৃতীয়ত, বিষয়টি হলো বিগত কয়েক দশকে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হলেও ভরণপোষণের কৃষি থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের আরো অনেক সময় লেগে যেতে পারে। কারণ আমাদের কৃষি শ্রমিকের একটা বড় অংশ অদক্ষ। যদিও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে, যার জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি অপরিহার্য।

আমাদের কৃষিনীতিতে বরাবরই কৃষি ভর্তুকির কথা উল্লেখ থাকলেও তার পরিমাণ নির্ধারিত হয়নি। যার ফলে কৃষি ভর্তুকি সব সময়ই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। যেমন ২০১১-২০১২ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকিতে বরাদ্দ ছিল মূল বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে নেমে এসেছে ২ শতাংশ। ফলে কৃষি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে তার সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার, কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। সে যা-ই হোক, না কেন প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তার বাস্তবায়নে আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলোকে মনে রাখতে হবে। করোনাকালে সরকার কৃষিতে/পল্লি অর্থনীতিতে প্রণোদনা দিলেও এ খাতকে ঘিরে বিনিয়োগ কম। কৃষির আধুনিকায়নে সরকারি ভর্তুকি ও বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উত্সাহিত করতে হবে। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করা জরুরি, যেখানে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের উত্সাহিত করার জন্য কৃষিতে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ পরিবেশ  তৈরির পরিকল্পনা থাকবে।

চতুর্থত, বর্তমান বছরে (২০২১)  বাংলাদেশ  উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ায় স্থান করে নিয়েছে যেখানে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম এবং বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য জোগান দিতে হলে কমপক্ষে ৪.৫ শতাংশ হারে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন। আবার বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে (২০১৮) সার বীজ সেচ কৃষি উপকরণের ইত্যাদির কথা বলা আছে এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শস্য প্রাণিসম্পদের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা ইত্যাদি সরকারের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের কৃষি জমি পানি এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মেধাশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে। সেজন্য কৃষির উদ্ভাবিত সব প্রযুক্তিকে মাঠ পর্যায়ে নেওয়ার জন্য বিজ্ঞানমনস্ক উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের জন্য কৃষি হতে পারে একটি উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্র। করোনার অভিঘাতে অভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেশকিছু দেশ। সে সময় অর্থ ব্যয় করেও বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নিতে হবে। চীন যেমন সুপার হাই প্ল্যান্ট ডেনসিটি টেকনিক ব্যবহারের মাধ্যমে শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে শস্য উত্পাদনের পরিমাণ বাড়িয়েছে, চারা রোপণ থেকে শুরু করে উন্নত ও আধুনিক সেচ পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে তারা শস্য উত্পাদন বৃদ্ধি করেছে এবং বাংলাদেশের  সরকারের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা ও নীতিসহায়তা পেলে দূর  হবে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা সংকটও। তবে খাদ্যশস্যের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষায় কার্যকর আধুনিক মজুত ব্যবস্থাও গড়তে হবে ও রিমোট সেন্সিং টুল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উত্পাদন ও ফসলের ক্ষতিবিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ জরুরি। চীন যেমন সুপার হাই প্ল্যান্ট ডেনসিটি টেকনিক ব্যবহারের মাধ্যমে শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে শস্য উত্পাদনের পরিমাণ বাড়িয়েছে। চারা রোপণ থেকে শুরু করে উন্নত ও আধুনিক সেচ পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে তারা শস্য উত্পাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশেও সরকারের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা ও নীতিসহায়তার প্রয়োজন। দূর করতে হবে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা সংকটও। দেশে ছোট ছোট খামারভিত্তিক চাষাবাদের কারণে প্রায়ই জমিতে যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে সমবায়ের ভিত্তিতে উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। তবে খাদ্যশস্যের অপচয় ও বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষায় কার্যকর আধুনিক মজুত ব্যবস্থাও গড়তে হবে। রিমোট সেন্সিং টুল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উত্পাদন ও ফসলের ক্ষতিবিষয়ক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ফসল ও ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমায় এবং উচ্চমানসম্মত পণ্য উত্পাদনে দ্রুততম ও সময়ানুগ পরিচালনা নিশ্চিত করে। তাই উচ্চফলন ও লাভজনক লাগসই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবলম্ব্বনের মাধ্যমে টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

n লেখক :কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন,

 সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা