পেন-এর নারীভাবনা

নারী নিজেকে যেন প্রতিনিয়ত উত্সর্গ করে চলেছে। তাকে উদ্দেশ্য করে যা-ই করা হয়, তা-ই হয়তো কম হয়ে যাবে। তার পরও আলাদা করে একটি দিন নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য বরাদ্দ হয়েছে—৮ই মার্চ।

মূলত দিবসটি উদ্যাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মজুরি-বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সেই মিছিলে চলে সরকারের লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন।

বাংলাদেশে ঠিক কত নারী প্রতি বছর পারিবারিক সহিংসতা বা যৌন হয়রানির শিকার হয় তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। নির্যাতনের প্রতিকারের ক্ষেত্রে অজ্ঞতার বিষয়টিই এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ আর এর সঙ্গে আছে নির্যাতনের শিকার নারীকে উলটো দোষারোপ করার প্রবণতা। যৌন হয়রানির প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির এগিয়ে আসা আর সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সেটি নিশ্চিত করা গেলেই হয়রানি প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রকৃত সহায়তা নিশ্চিত করা যাবে।

পেন ইন্টারন্যাশনালের নীতিমালা

অহিংসতা : নারী ও মেয়েশিশুদের প্রতি আইনগত, লিঙ্গগত, শারীরিক, মৌখিক ও ডিজিটাল—সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করে; এমন এক পরিবেশের প্রবর্তন করা—যেখানে নারী ও মেয়েশিশুরা নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে। এছাড়া সব রকম জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ব্যাপক অনুসন্ধান ও শাস্তি প্রদান এবং ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

নিরাপত্তা : নারী লেখক এবং সাংবাদিকদের রক্ষা করা এবং অনলাইনে ও বাইরের পৃথিবীতে নারী লেখক এবং সাংবাদিকদের হয়রানি এবং সহিংসতা বন্ধের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

শিক্ষা : সব নারী ও মেয়েশিশুকে মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিক্ষার সব স্তরে জেন্ডার বৈষম্য বিলোপ; এবং নারীরা যাতে লেখালেখি ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষার অধিকার চর্চা করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।

সমতা : আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে পুরুষদের পাশাপাশি নারীর সমতা বিধান করে, নারীর প্রতি সব রকম বৈষম্যের জন্য দণ্ড প্রদান করা; এবং বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা; এবং নারী লেখকদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাধ্যমে সবার জন্য পূর্ণ সমতা নিশ্চিত করা।

প্রবেশাধিকার : নারীকে পূর্ণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সক্ষম করার জন্য—তাদের পূর্ণমাত্রায় নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিগত বিষয়গুলোতে প্রবেশাধিকারসহ সব গণমাধ্যমে ও সাহিত্য রচনায় নারীকে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। উপরন্তু, নারী ও মেয়ে শিশুদের সব ধরনের গণমাধ্যমে নিজেদের প্রকাশের স্বাধীনতা জন্য তাদের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

সমমর্যাদা : নারী লেখকদের সমান অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ প্রবর্তন এবং নারী লেখক ও সাংবাদিক কোনো রকম বৈষম্য ছাড়াই পুরুষদের সঙ্গে সমভাবে কর্মে নিযুক্ত হবেন ও বেতন পাবেন, তা নিশ্চিত করা।

পেন ইন্টারন্যাশনালের নারীবিষয়ক ইশতেহার

১৯২১ সালে, লন্ডনে সর্বত্র লেখকদের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা প্রবর্তন; পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ; মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থান গ্রহণ এবং লেখকদের হয়রানি, মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা, বন্দিত্ব এবং মতপ্রকাশের কারণে হত্যা—ইত্যাদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে ভূমিকা রাখার জন্য পেন ইন্টারন্যশনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৭ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর, ইউক্রেনের লিভিভ শহরে, ৮৩তম বিশ্ব সম্মেলনে, মুখপাত্রদের সভায় পেন ইন্টারন্যশনালের নারীবিষয়ক ইশতেহারটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়েছে। পেন চার্টারের প্রথম এবং প্রতিষ্ঠাতা নীতি সুদৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, ‘সাহিত্যের কোনো সীমানা নেই।’ এ ধরনের সীমানা মূলত দুটি দেশ এবং লোকজনের সীমানার ট্র্যডিশনাল ধারণা। এই পৃথিবীর প্রায় সব নারীর জন্য—সম্ভবত সবচেয়ে কঠোর সীমান্ত হলো তার ঘরের দরজা—যে ঘরে সে বসবাস করে, হোক সেটা তার বাবা অথবা স্বামীর বাড়ি। নারীদের স্বাধীন বাক্শক্তি, পড়ার অধিকার, লেখার অধিকার আছে। তাদের সশরীরে, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঘুরে বেড়ানোর অধিকার আছে। তবে, কিছু সামাজিক রীতিনীতি আছে—যেগুলো নারী যে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলাফেরা করে—তা বিবেচনা করে না।

পেন বিশ্বাস করে, নারীর প্রতি সহিংসতা—সব ক্ষেত্রে, ঘরে বাইরে সব জায়গায়, বিপজ্জনক রকমের নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি করে। অথচ এ বিশ্বের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্য মানবাধিকারের প্রতি বারংবার শ্রদ্ধা আরোপ করে চলছে। আর এগুলো নারী ও মেয়েশিশুদের প্রতি সব রকম অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অথবা প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। পেন বিশ্বাস করে যে, একজন মানুষকে স্তব্ধ করা অর্থ হলো তার উপস্থিতিকে অস্বীকার করা। এটা একধরনের মৃত্যু। নারীর সৃজনশীলতা এবং জ্ঞানের পূর্ণ ও স্বাধীন প্রকাশ ছাড়া মানবতা হারিয়ে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

n লেখক : সাধারণ সম্পাদক, পেন বাংলাদেশ।