শুভ্র ঘোষ
আমাদের শৈশবকালে ‘ঘুষখোর’ শব্দটি গালি বলে বিবেচিত হতো। কোনো ঘুষখোর সম্পর্কে খবর প্রচারিত হলে মনে হতো সেই ঘুষখোরের ছেলেমেয়ের কথা। বিচলিত হতাম এ কথা ভেবে যে, তারা নিজেরা কোনো অন্যায় না করেও শুধু তাদের পিতার কারণে ‘ঘুষখোরের সন্তান’ পরিচয়ের লজ্জা নিয়ে অন্য সবার সামনে কিভাবে মুখ দেখাবে। ঘুষ খেয়ে ধরা পড়ার পর লোকনিন্দার কথা ভেবে আত্মহত্যা করার ঘটনাও তখন ঘটেছে বলে মনে পড়ে। আর এখন! ঘুষ খাওয়াটা ডালভাত হয়ে গেছে। ঘুষখোররা বুক ফুলিয়ে সমাজে সবার সালাম নেয়। আর তা হবেই বা না কেন? এক মন্ত্রী তো বলেছেনই, ‘ঘুষ’ নাকি আসলে ঘুষ না। কোনো কাজ দ্রুত করে দেওয়ার জন্য টাকা নেওয়াটা কোনো অপরাধ নয়। এটি সব দেশেই আছে। এটিকে নাকি ‘স্পিড মানি’ বলা হয়ে থাকে!
ঘুষ খাওয়াটা লুটপাট, দুর্নীতি ইত্যাদি ধরনের অপরাধেরই একটি বিশেষ রূপ মাত্র। এসব অপরাধীর মধ্যে যেমন চুনোপুঁটি আছে, তেমনই আছে রুই-কাতলা। রুই-কাতলারা এদের মাথায় অবস্থান করলেও এবং তাদের পাত্রেই লুটের ভাণ্ডারের বড় অংশ জমা হলেও, সাধারণ মানুষ চুনোপুঁটিদের অত্যাচারের সরাসরি শিকার। ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজদের, বিশেষ করে তাদের মধ্যকার ‘রুই-কাতলা’দের সাজা দেওয়াটা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাটা যদি এমনই থেকে যায়, যাতে করে প্রতিনিয়ত দুর্নীতিবাজ সৃষ্টি হতে থাকে, তাহলে মাঝে-মধ্যে কয়েক ডজন অথবা কয়েক শ দুর্নীতিবাজকে আটক করে ও শাস্তি দিয়েও সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না। ফুটো কলসিতে যতোই পানি ঢালি, কলসি কিন্তু তাতে কখনোই ভরবে না।
ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারটি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার একটি অভিপ্রকাশ মাত্র। যদি এ কথাটি সত্য হয়, তাহলে এই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে কী করতে হবে? শুধু কি অভিপ্রকাশটিকে (অর্থাত্ শুধু ঘুষ-দুর্নীতির বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি) আক্রমণ করলেই চলবে? কিংবা শুধু কি অভিপ্রকাশের উত্স (অর্থাত্ শুধু প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে) আক্রমণ করার কাজে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে? আসলে এই দুটোর কোনো একটি আলাদাভাবে সফলতা আনবে না। দুটো কাজকেই একইসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অভিপ্রকাশের ঘটনাবলি রুখে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার আর্থ-সামাজিক উত্সকেও আঘাত করতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতির প্রবণতার জন্মদানকারী সেই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা উত্পাটন করে এমন একটি বিকল্প আর্থ-সামাজিক ভিত্তি সৃষ্টি করতে হবে, যা সহজাতভাবে ঘুষ-দুর্নীতির লালনকারী নয়।
মাগুরা