শাহাবুদ্দীন
শুধু বিদ্যালয় সরকারি বা নতুন সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন করলেই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে না। প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চমান রক্ষায় সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষক। একমাত্র যথাযথ টিচার এডুকেশনই নিশ্চিত করতে পারে স্ট্যান্ডার্ড প্রাইমারি টিচার্স। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের (বর্তমানে প্রশিক্ষণ শব্দটি প্রতিস্থাপন করে শিক্ষক-শিক্ষণ পরিভাষা ব্যবহূত হচ্ছে) ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৫৪ সালে ইংরেজ পণ্ডিত উডের ডেসপাচের সুপারিশ অনুসারে অবিভক্ত বাংলায় গ্রেডেড স্কুল পদ্ধতির সূচনা হয়। সে সময় প্রাথমিক শিক্ষা নিম্ন প্রাথমিক (১ম ও ২য় শ্রেণি) এবং উচ্চ প্রাথমিক (৩য় ও ৪র্থ শ্রেণি) ধারায় বিভক্ত ছিল। সে সময়কার প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কথা কেউ ভাবেননি। এ থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে অবহেলার বহু পুরনো চিত্র সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ১৯০২ সালে সর্বপ্রথম গুরু ট্রেনিং (জিটি) স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। যথার্থ নামই বটে! প্রাথমিক শিক্ষকরাই তো আদতে সবার শিক্ষাগুরু!
১৯৫১ সালে পিটিআই স্থাপনের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৫টি সরকারি পিটিআই এবং ২টি বেসরকারি পিটিআই রয়েছে। সত্তরের দশকে পিটিআইসমূহে ৯ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে পিটিআইসমূহে এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট-ইন-এডুকেশন (সি-ইন-এড) কোর্স চলে আসছিল। এক পর্যায়ে দেখা গেল চলমান সি-ইন-এড কোর্সও কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা শেষে দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সি-ইন-এড কোর্সটিকে বদলে ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্স প্রবর্তন করা হয়। এ কোর্সের ভিত্তি হচ্ছে মনোবিজ্ঞানের গঠনতত্ত্ববাদ। শিক্ষণলাভের ক্ষেত্রে তত্ত্বটি অতি আধুনিক ও কার্যকর। ২০১২ সালের জুলাই থেকে দেশের ৭টি বিভাগের ৭টি পিটিআইতে পরীক্ষামূলকভাবে ডিপিএড কোর্সটি চালু করা হয়। ২০১৫ সালে দেশের অর্ধেকেরও কম পিটিআইতে ডিপিএড কোর্স চালু করা হয়। ডিপিএড কোর্সের মেয়াদ ১৮ মাস। এর মধ্যে ১২ মাস পিটিআইতে অবস্থান করে শিক্ষকদের শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়। শেষের ৬ মাস শিক্ষকরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করেন। গাঠনিক ও সামষ্টিকভাবে কোর্সটির মূল্যায়ন করা হয়। বিদ্যালয়ভিত্তিক বিষয় শিখন-শেখানোর কৌশল ছাড়াও ডিপিএড কোর্সে পেশাগত শিক্ষার অংশ হিসেবে সিমুলেশন, ব্রেইনস্টর্মিং দলীয় কাজ, কার্যোপযোগী গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ফলাবর্তন এবং শিক্ষা বিজ্ঞানের ওপর শিক্ষা দেওয়া হয়। বিষয়গুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী।
কিন্তু ডিপিএড কোর্সের প্রশিক্ষকের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সংযোগ সীমিত। নিয়োগের পরই ডিপিএড কোর্স সম্পন্ন করে বিদ্যালয়ে যোগদান করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। ডিপিএড বিষয়টি তাত্ত্বিক এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা। এখানে সর্বোচ্চ ২০ জন শিক্ষার্থীর বাইরে একজন শিক্ষকের পক্ষে একটি নির্দিষ্ট পিরিয়ডে কোনোক্রমেই এটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এজন্য শূন্যপদগুলোতে ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়াও ডিপিএড কোর্স সম্পন্নকারী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারীদের বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পিটিআই/ইউআরসিতে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োগ দিলে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিঃসন্দেহে বাড়বে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সময় নিম্নধাপে বেতন নির্ধারণের বিধান থাকায় তাঁদের মূল বেতন কমে যায়। ফলে তাঁদের আনুষঙ্গিক ভাতাও কমে। ফলে শিক্ষকগণ এ প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। মানসম্মত শিক্ষার পূর্বশর্ত মানসম্মত শিক্ষক তৈরি করতে হলে এ বিষয়ে দ্রুত প্রদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, মাননীয় সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।
যশোর