সরকার ভারত থেকে আরো বিদ্যুত্ আমদানি করতে চায়

প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আরো বিদ্যুত্ আমদানি করতে চায় সরকার। ব্যয়বহুল এলএনজির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশে চাহিদার চেয়ে উত্পাদনক্ষমতা বেশি থাকলেও বিদ্যুত্ উত্পাদনে ও বিতরণে ভুল নীতি-পরিকল্পনার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

গ্যাস ও বিদ্যুত্ খাতের শীর্ষ দুই সংস্থা পেট্রোবাংলা এবং পিডিবি সূত্র জানায়, দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করছে সরকার। দেশজ প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলএনজি মিশিয়ে যে পরিমাণ গ্যাস পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে তার অর্ধেকের বেশি অংশ ব্যবহার করছে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুত্ উত্পাদনকেন্দ্রগুলো। একদিকে ব্যয়বহুল জ্বালানি থেকে উত্পাদন, অন্যদিকে ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুত্ সরবরাহ দেশের জ্বালানি অর্থনীতিতে বড় সংকট তৈরি করছে।

বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এলএনজি থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কারণে পিডিবিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানি করাকে ভালো বিকল্প মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আমদানিকৃত প্রতি ঘনফুট এলএনজির বর্তমান দাম প্রায় ২৭ টাকা। আর পিডিবির কাছে তা বিক্রি করা                  হচ্ছে চার টাকায়। অর্থাত্ প্রতি ঘনফুটে মূল্যঘাটতি ২৩ টাকা। পিডিবি চার টাকা মূল্যে গ্যাস পেয়েও ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুত্ বিক্রি করছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন কমিয়ে দিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি এবং বিদ্যুত্ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও গুরুত্বসহ বিবেচনায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের অক্টোবরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা গ্রিডলাইন হয়ে বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুত্ রপ্তানি করে ভারত। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে দৈনিক ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি করছে। গত ছয় বছরে এ আমদানি বাবদ ১৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা খরচ করেছে পিডিবি।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিভিন্ন উত্স জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমদানি আরো বাড়বে। তবে তা শুধু ভারত থেকেই নয়, নিকটবর্তী অন্য দেশ থেকেও হতে পারে। সরকারের সে পরিকল্পনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুেকন্দ্র আসবে, সেগুলোর জন্য আরো ১ হাজার ৪৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের একটি চাহিদাপত্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ দেশীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি শিগিগরই হচ্ছে না।

বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র রয়েছে ৭৯টি। এগুলোর মধ্যে সরকারি ৩৭টি, আইপিপি ২৯টি এবং রেন্টাল কেন্দ্র ১৩টি। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উত্পাদনক্ষমতা ১২ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের অনুমোদিত লোড ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ১ হাজার ২৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণে সরকার ভুল নীতি গ্রহণ করেছে। তার মাশুল দিতে হচ্ছে জনগণকে। ভবিষ্যতে আরো বিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমাদের বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণনীতি এবং প্রক্রিয়া কোনোভাবেই আদর্শ অবস্থায় নেই।’

বিদ্যুত্ বিভাগ ও পিডিবি জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা ২১ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট। কয়েকটি বড় বিদ্যুত্ প্রকল্প থেকে আগামী দুই বছরের মধ্যে আরো সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গড় চাহিদা দৈনিক সাড়ে ৯ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। অর্থাত্ বিদ্যুতের মোট উত্পাদনক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহূত হচ্ছে না।