স্মরণকালের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারত ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারির এ ঘোষণাকে আশার আলো বলে অভিহিত করেছে ইউরোপীয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ (ইএফএসএএস)। সংস্থাটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি বিশদ বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
ইএফএসএএস বলেছে, বিষয়টি দেশ দুইটির জন্য জাতীয়ভাবে সংবেদনশীল। যুদ্ধবিরতির সফলতা দেখতে হলে আন্তরিক উদ্দেশ্যে এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে কিন্তু তারা সমস্যাগুলোর সমাধানে আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে। পাকিস্তানি পত্রিকা ডনের কথা বিশ্বাস করলে বলতে হবে এই যুদ্ধবিরতির চুক্তি দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্ররোচনাতেই হয়েছে।
বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, ২২ ফেব্রুয়ারির এ চুক্তি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধবিরতি নয়। ২০০৩ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষাই নতুন চুক্তির লক্ষ্য। তখন ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ও লাইন অফ কন্ট্রোলে শান্তি বজায় রাখাই সেই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল। এটা কার্যকরও হয়েছিল। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সীমান্তে একটি গুলিও ছোঁড়া হয়নি। এরপরই নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতির অবনতি হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেশটির সংসদে জানিয়েছিল, ২০২০ সালে জম্মু-কাশ্মীরের লাইন অফ কন্ট্রোল ও অন্যান্য সীমান্তে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের ৫১৩৩টি ঘটনা ঘটেছে এবং এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন। তবে ডন পত্রিকা বলছে, শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা আসলে তিন হাজার এবং এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন।
দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনের (ডিজিএমও) মধ্যে নজিরবিহীন আলোচনার পরই যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। ২০০৩ সালের চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটা নিশ্চিতভাবে কৌশলগত পদক্ষেপ হলেও ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে এ ঘোষণা ভূমিকা রাখবে। এর আগে ভারত বলেছে, ইসলামাবাদের সঙ্গে আরও বিভিন্নভাবে কাজ করবে দেশটি। তবে আগে পাকিস্তানকে লাইন অফ কন্ট্রোল এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বলেছে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তারা নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনা করতে উৎসাহী নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানের ওপর মনিটরিং চালিয়ে যাবে ভারত। আর জম্ম-কাশ্মীর নিয়ে কথা বলবেই পাকিস্তান। এসব এড়ানো যাবে যদি ২২ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধবিরতি সত্যিই দু'পক্ষের জন্য কোনো বাস্তব লাভ বয়ে আনে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকি বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি আনার জন্য এটা একটা বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছেন, লাইন অফ কন্ট্রোল বরাবর দুই দেশই সংঘর্ষ কমিয়ে আনবে ও যোগাযোগ বাড়াবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী। একইসাথে এলওসি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের মুখপাত্র নাবিলা মাশরালি বলেছেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিবস্থার জন্যে এ যুদ্ধবিরতি খুব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে, ইউএই'র সাথে ভারত ও পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সংযোগ আছে। আমরা এই চুক্তির জন্য দুই দেশের চেষ্টার প্রশংসা করছি। এত ব্যাপক আশাবাদের মধ্যেও একটা প্রশ্ন ঠিকই উঠে আসছে। তা হচ্ছে এবারের যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে! এটা কি ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে পারবে নাকি ফের এই সীমান্তে রক্ত ঝরা শুরু হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ জানে না।
ইত্তেফাক/এসএ