চা-শ্রমিকদের বিদ্যুত্ বিলের তিন গুণ টাকা আদায়

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা

খুবই সামান্য মজুরি পান চা-শ্রমিকেরা। অথচ তাদের বিদ্যুত্ বিল পরিশোধের নামে শুভংকরের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। সাপ্তাহিক তলব থেকে দুই কিস্তি বা তিন কিস্তিতে বিদ্যুত্ বিলের দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শ্রমিকেরা। চরম ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন তারা। সম্প্রতি কয়েকটি বাগানের শ্রমিকদের কেটে নেওয়া বিদ্যুত্ বিলের সঙ্গে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির অফিসের বিলের তুলনা করে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ডানকান ব্রাদার্স, ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ২২টি চা-বাগানে বসবাসরত শ্রমিকেরা পল্লী বিদ্যুত্ থেকে বিদ্যুত্ সংযোগ নিয়েছে। প্রত্যেক পরিবারের জন্য রয়েছে আলাদা মিটার।

জানা গেছে, শ্রমিকদের বিদ্যুত্ বিল আলাদা আলাদা করে দেওয়া হয় না। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির কমলগঞ্জ জোনাল অফিস শ্রমিকদের নাম ও মিটার নম্বরের বিপরীতে প্রতিটি বাগানের জন্য একেকটি শিট বা তালিকায় বিল পাঠানো হয়। বিদ্যুত্ বিল আদায়ের দায়িত্ব বাগানের টিলা ক্লার্কের। প্রতি সপ্তাহে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি বা তলব প্রদানের সময় শ্রমিকদের টাকা কেটে রাখা হয়।

সাপ্তাহিক এই মজুরি থেকে কোনো বাগানে এক কিস্তি, দুই কিস্তি কিংবা তিন কিস্তিতে বিদ্যুত্ বিল কেটে রাখা হয়। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ বিলে বাড়তি হারে টাকা কেটে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাড়তি টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়ে শ্রমিকদের অভিযোগ করলেও এসবে কোনো কাজ হচ্ছে না।

শমশেরনগরের ফাঁড়ি কানিহাটি চা-বাগানের শ্রমিক চন্দ্ররতি রিকিয়াশন জানান, তার হিসাব নম্বর ৯৬৭ এবং মিটার নম্বর ১৩৪০-এর বিপরীতে গত ডিসেম্বর মাসে ১৩৪ টাকা হারে তিন কিস্তিতে কেটে রাখা হয় ৪০২ টাকা। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির কমলগঞ্জ অফিসে গিয়ে তার ঐ মাসের বিদ্যুত্ বিল দেখা যায় ১৬৮ টাকা। ঐ একই বাগানের শুকর রিকিয়াশনের ১২২০ মিটার নম্বরে ডিসেম্বরে বিল আসে ১০৫ টাকা। তিন কিস্তিতে কেটে নেওয়া হয় ১২১ টাকা। ফুল কুমারী রবিদাসের ১৩০০ মিটার নম্বরের বিপরীতে বিল আসে ১৬৮ টাকা। তিন কিস্তিতে কেটে নেওয়া হয় ১৯৯ টাকা।

শমশেরনগর চা-বাগানের নারী নেত্রী লছমি রানী রাজভর, দেওছড়া চা-বাগানের রামনারায়ণ গৌড়, কানিহাটি চা-বাগানের শ্রমিকনেতা ও ইউপি সদস্য সীতারাম বীন, ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) পাত্রখোলা চা-বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি দেবাশীষ চক্রবর্তী শিপনসহ চা-শ্রমিকেরা বলেন, চা-বাগানে আমাদের প্রতি মাসে বেশি পরিমাণে বিদ্যুত্ বিল কেটে নেয়। এসব বিষয়ে ম্যানেজমেন্টকে অনেক অভিযোগ দেওয়া হলেও তারা বাড়তি টাকা কেটে নেওয়া বন্ধ করেননি। আলীনগর চা-বাগানের ফাঁড়ি সুনছড়া চা-বাগানের হেড টিলা ক্লার্ক গোপাল চক্রবর্তী বলেন, শ্রমিকদের নামে বিদ্যুত্ বিল তালিকা আকারে বাগানে আসে। সেখান থেকে আমার কাছে যে তালিকা আসে এবং শ্রমিকদের মিটার নম্বরের বিপরীতে যে টাকা আসে, সেগুলোই দুই কিস্তিতে কাটা হয়। তবে বাগানে মন্দির, মসজিদ, ইউনিয়নের চাঁদা, সামাজিক অনুষ্ঠানের টাকাও কর্তন করা হয়। সে কারণে ভুলবশত কারো ক্ষেত্রে ১০-২০ টাকা বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ধলই ভ্যালীর সভাপতি ধনা বাউরী বলেন, ‘আমার নিজের বাগানে ম্যানেজারের সাথে বসে কথা বলেছি আমাদের নামে নামে পৃথক বিল দেওয়ার ব্যবস্থা করানোর জন্য।’ মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির কমলগঞ্জ জোনালের ডিজিএম গোলাম ফারুক মীর বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চা-বাগানে এভাবে বিদ্যুত্ বিল দেওয়া হচ্ছে। তাদের নিজস্ব জমি না থাকায় পৃথক মিটার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের কোনো ভুল নেই এখানে।’