দুধরাজ নামে পরিচিত সাহেব বুলবুলি এই উপমহাদেশের অন্যতম সুন্দর পাখি। পুরুষ পাখির মাঝে রয়েছে দারুণ এক রাজকীয় সৌন্দর্য। পাখিটি চোখে পড়লে নজর ফেরানো দায়।
যখন এই পাখি ওড়ে—সে দৃশ্য যে কত মনোমুগ্ধকর তা বলে বোঝানো যাবে না। মনে হবে হয়তো কোনো চিত্রপট। পাখিটির দেখা পাওয়াও সহজ নয়। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে পাখিটিকে ‘দুধরাজ’, ‘সাহেব বুলবুলি’, ‘সুলতান বুলবুল’, ‘শাহ বুলবুল’, ‘নন্দন পাখি’ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। এই পাখি দেখতে বুলবুলির মতো হলেও বুলবুলির সমগোত্রীয় নয়।
লেজের জন্যই ছোট আকারের ঝুঁটিওয়ালা এই পাখি অন্য পাখি থেকে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। এর লম্বা লেজ ওড়ার সময় ঢেউয়ের মতো দুলতে থাকে। সুদীর্ঘ লেজ সাহেব বুলবুলির সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন লম্বা লেজ নিয়ে এরা উড়ে বেড়ায়, তখন মনে হয় যেন স্বর্গ থেকে বেড়াতে এসেছে পৃথিবীতে।
সাদা-কালো ছাড়াও লালচে রঙের এ পাখি দেখা গেলেও আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে পুরুষ রং বদলে সাদা-কালো হয়ে যায়। ছেলে দুধরাজের লেজ লম্বা আর মেয়ে দুধরাজের লেজ অপেক্ষাকৃত ছোট। আকার অনেকটা শালিকের মতো; প্রায় ২০ সেন্টিমিটার। পুরো মাথার ঝুঁটি কালো। চোখ কালচে-বাদামি, চোখের রং নীল, নীলচে ঠোঁট। স্ত্রীর ডানা ও লেজ লাল এবং পেট কালচে। পুরুষের লেজের মাঝের পালক ফিতার মতো অত্যন্ত লম্বা। এর ডাক বেশ কর্কশ: চ্রিট, চিউচিউ, কুয়িঙ্ক।
মে থেকে জুলাই মাস হলো এদের প্রজননকাল। এরা প্রজননকালে অনেকটা কাপের মতো বাসা তৈরি করে, এর পর স্ত্রী পাখি তিন থেকে চারটি ডিম পাড়ে। ১৪-১৫ দিনেই ডিম ফোটে। মা-বাবা উভয়ই বাচ্চাদের যত্ন করে। বাচ্চারা ১৬ থেকে ১৯ দিনে বড় হয় ও উড়তে শিখে যায়। তিন-চার বছর বয়সে এরা রং বদলে সাদা-কালো হয়ে ওঠে। সাধারণত ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
সাহেব বুলবুলি বা দুধরাজের কয়েকটি প্রজাতি লক্ষ করা যায়। সাধারণত বাংলাদেশে দুটি প্রজাতির বেশি দেখা যায় না। এই পাখি বেশ চঞ্চল স্বভাবের; তাই কোথাও বেশিক্ষণ স্থির হয়ে থাকতে পারে না। তাই পাখিটিকে দেখতে হলে খুব ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। এই পাখিদম্পতি একসঙ্গে থাকতে খুব ভালোবাসে। খুব সুন্দর ও যত্ন করে গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে বাসা বানায় এরা। ঘাস, লতাপাতা, মাকড়সার জাল দিয়ে বানানো বাসা দূর থেকে খুব চমত্কার দেখায়। এরা বাঁশঝাড়ে থাকতে বেশি পছন্দ করে, তবে অনেক সময় আম-কাঁঠালের বাগানেও দেখা মেলে। এদের প্রিয় খাবার বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। উড়ন্ত পোকা ধরতে এরা খুবই পারদর্শী। উত্তরাঞ্চলের দিকে এদের বেশি দেখা যায়।