পরিবর্তনের নতুন আলোয়

 ‘নারী, তুমি আলোকিত হও নিজের আলোয়, আলোকিত কর সারা বিশ্বকে।’ মেধা, প্রজ্ঞা, পরিশ্রম এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখাতেই নারীর পদচারণা বর্তমানে পুরুষের থেকে কোনো অংশে কম নয়। এলিজা কার্সনের মঙ্গল অভিযানে যাবার প্রস্তুতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা হ্যারিসের নির্বাচিত হওয়া কিংবা মেক্সিকোর সাম্প্রতিক নির্বাচনে পার্লামেন্টের দুইটি কক্ষেই সমানসংখ্যক নারী ও পুরুষ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিষ্ঠা ও যথার্থ যোগ্যতারই পরিচায়ক।

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নারী যেখানে তার স্বীয় যোগ্যতার ছাপ রাখছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে, সুন্দর আগামীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে দুর্বার গতিতে; সেখানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নারীরা প্রতিনিয়ত হচ্ছে অবহেলিত এবং নির্যাতিত। আমাদের স্বদেশের দিকে তাকালেও নারী লাঞ্ছনার এক বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করা যায়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে বিগত বছরে (২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫৪৬ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। এছাড়াও ৯৭৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। সব ঘটনা সামনে না আসায় ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা এসব পরিসংখ্যানের চেয়ে আরো অনেক বেশি মনে করা হয়।

ঢাকার কুর্মিটোলায় ঢাবি শিক্ষার্থীর ধর্ষিত হওয়া, সিলেটের এমসি কলেজে নববধূকে দল বেঁধে ধর্ষণ, কিংবা নোয়াখালীতে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানোর ঘটনাগুলো এ দেশে নারীদের নিরাপত্তার অভাবকেই নির্দেশ করে। এছাড়া যৌতুকের দায়ে নির্যাতনসহ অন্যান্য ঘটনা রয়েছেই। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন কিংবা কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং পারিবারিকভাবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না জাগিয়ে তোলা এবং মানুষের নৈতিক অবক্ষয়েরই ফলাফল।

নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় বিচারব্যবস্থা বারবার আমাদের হতাশ করেছে। কারণ অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে তারা ক্ষমতার জোরে বিচারব্যবস্থার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। একটি ঘটনা সাময়িকভাবে ব্যাপক আলোচিত হলেও কিছুদিন পর তা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। বিচারহীনতা নারীকে আরো বেশি অনিরাপদ করে তুলেছে। এই ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে যদি বেরিয়ে আসা না যায়, তবে নারীর উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব না।

‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, ধীরে ধীরে নারী হয়ে ওঠে’—সিমোন দ্য বোভোয়ারের এই উক্তিটি নারীর জীবনে পুরোপুরি সত্য। সংস্কৃতির প্রচলিত ধারণা এবং পরিবার ও পরিবেশই আমাদের দেশসহ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নারীকে অবদমিত হবার শিক্ষা দেয়। যেমন—একটি কন্যাশিশুকে যে ধরনের খেলনা দেওয়া হয়, তা গৃহস্থালির সঙ্গে সম্পর্কিত। সেখানে পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল—এসব জিনিসই প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে একটি ছেলেশিশুকে দেওয়া হয় ব্যাট, বল, বন্দুক জাতীয় খেলনা। পুতুল দিয়ে কোনো একটি ছেলেকে যেমন গৃহমুখী বা গৃহস্থালির কাজে অভ্যস্ত করা হয় না, তেমনি কন্যাশিশুর হাতে বন্দুক দিয়ে শক্তিশালী বা সাহসী কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারই কন্যাশিশুকে অধীনতার শিক্ষা দেয়।

সন্তান পালনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মা-বাবারা একটি মন্তব্য প্রায়ই করে থাকেন। ‘তোমাদের মানুষ করতে ছেলেমেয়ে তফাত্ করিনি।’ সন্তান তো সন্তানই। তাদেরকে নিরপেক্ষভাবে শুধু ‘মানুষ’ হিসেবে দেখা যায় না? ‘তফাত্’ শব্দটিই এক মস্ত তফাতের সৃষ্টি করে। এভাবেই নারীকে অবজ্ঞার প্রাথমিক ধাপটি পরিবার থেকেই শুরু হয়।

সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অংশীদার হিসেবে বিশ্ব উন্নয়নে নারী এবং পুরুষ সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী সেখানে নারীকে পেছনে ফেলে বিশ্বের উন্নয়ন কোনোভাবে সম্ভবপর নয়।

সভ্যতার উন্নয়নে নারীর পারিবারিক, সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের (৩৯তম) ক্ষমতাধর নারী হিসেবে রয়েছেন। নারীরা এখন কর্মমুখী হচ্ছে এবং স্বাক্ষর রাখছে নিজেদের সাফল্যের। নারীরা এখন দশভুজার মতো  ঘর ও বাহির—সবই পরিচালনা করে চলছে সমান তালে।

অনানুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চ দিনটিকে প্রথম ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। নারীর অধিকার রক্ষা এবং লিঙ্গ সাম্যের উদ্দেশ্যের জন্য প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়; কিন্তু উদ্দেশ্য কি আদৌ সফল হয়? নারী দিবস বছরে এক বার আসে। দিনটিতে সবাই সোচ্চার হন। কোথাও কোথাও সভা হয়। শ্রদ্ধার কথা ফেরে মুখে মুখে। একটা সময়ে দিনটা শেষ হয়ে যায়। উদ্যাপনকারীরা ভাবেন, বেশ ভালোই কাটল এবারের দিবসটি। পরিবর্তিত হয় না কোনো কিছু। হলেও বড় কষ্টকর ভাবে, ধীরে ধীরে।

তবুও করোটিতে জ্বালাই আশার প্রদীপ। স্বপ্ন দেখি এমন একটা দিন আসবে যখন নারীদের অধিকার রক্ষায় আলাদা করে নারী দিবসের প্রয়োজন হবে না। বছরের ৩৬৫ দিনই হয়ে উঠবে নারী দিবস। তুমি নিজেও জানো না নারী, তোমার মধ্যে কতটা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে! বিশ্বকে নিজের আলোয় আলোকিত করেছ তুমি... তাই তোমায় জানাই হাজার প্রণতি।

n লেখক :শিক্ষার্থী :বাংলা বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।