রাজপরিবারে পা দেওয়ার পরই বুঝতে পেরেছিলেন মানসিক পীড়ন কতটা ভয়ংকর হতে পারে। একপর্যায়ে সেই পীড়ন এতটাই তীব্রতর হয়েছিল যে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাড়া জাগানো টেলিভিশন উপস্থাপক অপরা উইনফ্রেকে দেয়া সাক্ষাত্কারে এমন সব ভয়ানক দাবি করেছেন ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেল, যার জন্ম আমেরিকায়। কেবল মেগান নন, দুই ঘণ্টার সাক্ষাত্কারে প্রিন্স হ্যারিও বলেছেন অনেক বেদনার কথা। বর্ণবাদই তাকে ব্রিটেন ছাড়তে বাধ্য করেছে, এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।
সিবিএস টেলিভিশনের এর দুই ঘণ্টার এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি স্থানীয় সময় সোমবার যুক্তরাজ্যে আইটিভিতে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা। এই সাক্ষাত্কারে হ্যারি-মেগান দম্পতি বিভিন্ন বিষয় যেমন বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য, গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং রাজপরিবারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
এই সাক্ষাত্কারে কেঁপে উঠেছে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল। অবশ্য এই প্রভাবের খবর প্রকাশ্যে আসবে না বলে মনে করেন রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তবে এই সাক্ষাত্কারের খেসারত হিসেবে হ্যারি-মেগান দম্পতি তাদের ‘ডিউক অব সাসেক্স’ ও ‘ডাচেস অব সাসেক্স’ নামের রাজকীয় পদবি হারাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুরক্ষা পাইনি, আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম : মেগান
টিভি সাক্ষাত্কারে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে, তারা ডিউক ও ডাচেসকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। মেগান ঐ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘২০১৮ সালের মে মাসে বিয়ের পর থেকেই আমাকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। আমি বুঝতে পারি শুধু আমাকে যে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে না তা নয়, বরং পরিবারের অন্য সদস্যদের সুরক্ষা দিতে তারা মিথ্যা বলতেও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আমি আর আমার স্বামীকে সুরক্ষা দিতে তারা সত্যিটা বলতেও ইচ্ছুক ছিল না। তিনি একটি গুজবের উদাহরণ টেনে বলেন, ফ্লাওয়ার গার্লসদের পোশাক কেমন হবে সেই বিষয়টি নিয়ে মতামত দেওয়ার সময় ডাচেস অব কেমব্রিজকে (হ্যারির বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী কেট মিডলটন) কাঁদিয়েছিলেন তিনি। এই গল্পটি ট্যাবলয়েড পত্রিকায় মুখরোচক গল্প হয়ে উঠেছিল বলে জানান তিনি। মেগান বলেন, আসলে ঘটনাটি পুরো উলটো ছিল। তিনি বলেন, ঐ ঘটনার জন্য পরে কেট ক্ষমাও চেয়েছিলেন। সঙ্গে কিছু ফুল আর ছোট চিরকুট পাঠিয়েছিলেন সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য।
মেগান বলেন, একসময় তিনি একাকী বোধ করতে থাকেন, যখন তাকে বলা হয় যে, তিনি কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না। এমন একসময় দাঁড়ায় যখন তিনি মাসের পর মাস বাড়ি থেকে বের হননি। অপরাকে মেগান বলেন, তিনি একসময় ভাবতে শুরু করেন এর চেয়ে বেশি একা হওয়া সম্ভব নয়। অপরা তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, একপর্যায়ে তিনি নিজের ক্ষতি বা আত্মহত্যা করার চিন্তা করেছিলেন কি না? উত্তরে মেগান বলেন, ‘হ্যাঁ। এটা খুব বেশি স্পষ্ট ছিল। খুব স্পষ্ট এবং ভয়ংকর। সেসময় বুঝতে পারছিলাম না কার কাছে যাব।’
মেগান বলেন, গর্ভবতী থাকাবস্থায় হ্যারির সঙ্গে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময়কার এক ছবির কারণে আতঙ্কবোধ করেছিলেন তিনি। ঐ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে সকালে হ্যারির সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ হয়েছিল আমার। উইনফ্রে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি আর বেঁচে থাকতে চাননি?’ মেগান ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন। তিনি বলেন যে, ঐ রাতে তিনি ঐ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন, কারণ তিনি অনুভব করছিলেন যে, তিনি আর একাকী বোধ করতে চান না। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে মেগান বলেন, অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠানের সময় হ্যারি তার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন।
বর্ণবাদের কারণে দেশ ছেড়েছি :হ্যারি
দেশ ছাড়ার কারণ সম্পর্কে অপরা উইনফ্রের এক প্রশ্নের জবাবে প্রিন্স হ্যারি বলেন, এর বেশির ভাগ কারণই বর্ণবাদ। জন্মের আগেই তার ছেলের গায়ের রং নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। হ্যারি একটি ঘটনা স্মরণ করে বলেন, এক ব্যক্তি তাকে মিডিয়া নিয়ে কিছু না বলার অনুরোধ করেছিলেন। হ্যারি ঐ ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি যার সঙ্গে অনেক সম্পাদকের সম্পর্ক ছিল। ঐ ব্যক্তি তাকে বলেছিলেন, ‘হ্যারি, তুমি মিডিয়া নিয়ে কিছু বলতে যাবে না। কারণ তারা তোমার জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’ তিনি বলেন, ব্রিটেন খুবই গোড়ামিপূর্ণ বা বর্ণবাদের দেশ। হ্যারি তখন ঐ ব্যক্তিকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ব্রিটেন নয়, এ দেশের মিডিয়া বর্ণবাদী।’ কিন্তু তিনি উলটো হ্যারিকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, না, ব্রিটেনই বর্ণবাদী।
সান্ড্রিংহাম ভ্রমণে আমন্ত্রণ পাননি হ্যারি-মেগান
হ্যারি দাবি করেন, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তাকে হঠাত্ জানানো হয় যে, তিনি স্যান্ড্রিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে পারবেন না। গত বছরের ৮ জানুয়ারিতে তারা সিনিয়র রয়্যালস পদ ত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরই রানির সঙ্গে আলোচনায় বসার সুযোগ পান। হ্যারি বলেন, রানি প্রথমে তাকে সাক্ষাত্কারের কথা বলেও তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রানির প্রাইভেট সেক্রেটারির মাধ্যমে তাকে জানানো হয় যে, তিনি খুব ব্যস্ত আছেন। এরপর রানিকে ফোন দেন হ্যারি। তখন রানি তাকে বলেন, ‘আমি খুব ব্যস্ত। আমার ডায়ারিতে কর্মসূচি থাকলেও আমি দেখতে পাইনি।’ পুরো সপ্তাহ ব্যস্ত থাকবেন বলে রানি তাকে জানান।
ছেলে আর্চির গায়ের রং নিয়ে প্রশ্ন
মেগান মার্কেল বলেন, সবচেয়ে খারাপ সময়টি ছিল যখন রাজপরিবারের এক সদস্য হ্যারিকে তাদের ছেলের গায়ের রং নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, সে কতটা কালো হতে পারে। অপরা মেগানকে জিজ্ঞেস করেন যে, রাজপরিবার কেন তার ছেলে আর্চিকে প্রিন্স ঘোষণা করেনি।
১৯১৭ সালের একটি আইনের কারণে ডিউক এবং ডাচেস অব সাসেক্সের সন্তানরা স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্স কিংবা প্রিন্সেস হবেন না, যদি না রানি কোনো পদক্ষেপ নেন।
মেগান বলেন, আমার গর্ভবতী থাকার মাসগুলোতে আলোচনা চলছিল যে, তাকে (আর্চিকে) সুরক্ষা দেওয়া হবে না, তাকে হয়তো কোনো পদবি দেওয়া হবে না এবং জন্মের পর তার ত্বক কতটা কালো হবে তা নিয়েও উদ্বেগ এবং আলোচনা চলেছে। মেগান বলেন, এসব কথা হ্যারিকে বলা হয়েছিল এবং তার কাছ থেকেই তিনি এসব বিষয় জেনেছেন।
অপরা জিজ্ঞেস করেন যে, সন্তান বেশি বাদামি বর্ণের হলে তা নিয়ে সমস্যা হতে পারে বলে এ নিয়ে কোনো উদ্বেগ তাদের ছিল কি না। জবাবে মেগান বলেন, ‘এটা যদি আপনার অনুমান হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বেশ যুত্সই অনুমান।’ এ নিয়ে মন্তব্য কে করেছিলেন সে বিষয়ে অপরা জানতে চাইলে মেগান তার নাম বলেননি। তিনি বলেন, আমার মনে হয় এটা তাদের জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
হ্যারিও সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতে অসম্মতি জানিয়ে বলেন, ঐ আলোচনা আমি কখনোই কাউকে বলব না।
তবে রানি এবং প্রিন্স ফিলিপ এই তালিকায় নেই বলে সাক্ষাত্কারের বাইরে অপরাকে জানান তারা। হ্যারি বলেন, ‘গণমাধ্যমের কাছ থেকে মেগান যে ধরনের বর্ণবাদের শিকার হয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো স্বজনই মেগানের পক্ষে কথা বলতে এগিয়ে আসেননি। ঐ তিন বছরে আমার পরিবারের কেউ কোনো কথা বলেনি। এটা কষ্টকর।’
হ্যারি ও মেগান জানান, আসছে গ্রীষ্মে তারা আবার বাবা-মা হতে যাচ্ছেন। এবার তাদের কন্যা সন্তান হবে বলে জেনেছেন তারা।
রাজপরিবারে বাক স্বাধীনতা
এক প্রশ্নের জবাবে মেগান বলেন, রাজপরিবার আর প্রতিষ্ঠানটিকে (রাজতন্ত্র) যারা চালান, তারা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সত্তা। তিনি জানান, তার প্রতি রানির আচরণ সবসময়ই খুব চমত্কার।তবে অপরা যখন জানতে চান রাজপরিবারে নীরব থাকতেন, নাকি নীরব থাকতে বাধ্য করা হতো, সরাসরি জবাব না দিয়ে মেগান কেবল বলেন, দ্বিতীয়টি।
মা বেঁচে থাকলে দু:খ পেতেন
হ্যারি মনে করেন, তার আর মেগানের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা দেখলে তার প্রয়াত মা প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানা খুব রেগে যেতেন, ভীষণ দুঃখ পেতেন। হ্যারি আরো জানান, ২০২০ সালে রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন কেবল মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে। প্রাপ্য টাকাটাই পেয়েছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যা বললেন হ্যারি
সাক্ষাত্কারে হ্যারি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দাদির (রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ) সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই ভালো। প্রায়শই দাদির সঙ্গে তাদের কথা হয়। তবে বাবা প্রিন্স অব ওয়েলসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তেমন ভালো নেই। হ্যারি বাবার বিষয়ে হতাশ বোধ করে বলেন, ‘বাবাকে সব সময়ই ভালোবাসব। কিন্তু আমি অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছি।’ হ্যারি জানান তিনি যখন সরে আসতে চেয়েছিলেন, তখন প্রিন্স চার্লস তার ফোন ধরাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়াম সম্পর্কে হ্যারি বলেন যে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আসলেই ভিন্ন। তিনি জানান, তাকে আর্থিকভাবেও পরিবার থেকে সহায়তা করা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হ্যারি তার ভাই আর বাবাকে ‘রাজপরিবারের ব্যবস্থার ফাঁদে আটকে পড়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন হ্যারি।
সাক্ষাত্কারটি এমন এক সময়ে প্রচার হলো যখন হ্যারির দাদা ডিউক অফ এডিনবরা প্রিন্স ফিলিপ হূিপ্লের অস্ত্রোপচার শেষে হাসপাতালে সেরে উঠছেন। যদিও সাক্ষাত্কারটি আগেই ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক কোটি একাত্তর লাখ মানুষ এই সাক্ষাত্কার দেখেছেন। গত বছরের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজপরিবার ছাড়ার পর থেকে হ্যারি-মেগান দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন।
রাজপরিবারে সাক্ষাত্কারের প্রভাব কতটা
এই টিভি সাক্ষাত্কার নাড়া দিয়েছে বাকিংহাম প্রাসাদে। ১৯৯৫ সালে হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানা নিজের একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে ভঙ্গুর বিয়ের নানা কথা প্রকাশ্যে আনার পরও এতটা বিস্ফোরক সাক্ষাত্কার দেননি রাজপরিবারের কোনো সদস্য। বিবিসির রাজপরিবার বিষয়ক সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড বলছেন, হ্যারি-মেগানের কিছু কিছু অভিযোগ এতো বেশি ব্যক্তিগত যে, ধারণা করা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কোনো রাজপরিবারের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে না। তবে এই দম্পতি যে এখনো স্নেহধন্য সেটি রানি বারবারই স্পষ্ট করেছেন। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ভ্যানিটি ফেয়ার বলছে, রাজপরিবারের ওপর এই সাক্ষাত্কারের প্রভাব অবশ্যই পড়বে। তবে সেটা কতোটা তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মার্কিন প্রভাবশালী মিডিয়া ওয়াশিংটন পোস্টও একই রকম মন্তব্য করেছে।