>> খন্দকার আবুল হায়াত পুলক
বাংলাদেশের চিরাচরিত সমাজ-কাঠামোতে বেড়ে ওঠা একজন অনন্য নারী; যিনি তার সৃজনশীলতা আর অফুরন্ত কর্মশক্তি আর অদম্য মনের জোর নিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে যেখানে সবাই পিছপা হন, তখন তিনি নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায় প্রথাগত আর প্রচলিতকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বারবার। সফলতার দেখাও পেয়েছেন তিনি। এমনই এক সফল নারী নিশাত সুলতানা।
জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নওগাঁ জেলাতেই। মাঝখানে প্রায় চার বছর বাবার কর্মসূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কাটিয়েছেন। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছোট। তার প্রথম স্কুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ক্রিসেন্ট কিন্ডারগার্টেন। কৈশোরের পুরোটাই কেটেছে নওগাঁ জেলা শহরে, সেখানকার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে দৃপ্ত পদচারণা ছিল তার। ভালোবাসতেন গান ও আবৃত্তি। পড়াশোনার হাতেখড়ি মায়ের হাতে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন; এসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বিভাগে সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান লাভ করেন। নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। মা তার জীবনে বড় অনুপ্রেরণা। বাবাকে পেয়েছেন একজন কাছের বন্ধু হিসেবে।
নিশাত সুলতানার লেখক পরিচয়ে প্রথম আত্মপ্রকাশ ২০০৯ সালে। কর্মজীবনের শুরু ২০০৭ সালে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। প্রথমবারের মতো ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রথমবারেই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। কিছুদিন ব্র্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সহকারি কমিশনার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু তার সৃষ্টিশীল মন আর সবসময় নতুন কিছু করার তাগিদ তাকে সরকারি চাকরিতে স্থির হতে দেয়নি। পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সঙ্গে। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কাজ করতে করতে ভালোবেসে ফেলেন শিশুদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মজীবন। পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন সেভ দ্য চিল্ডড্রেন, কনসার্ন ও এডুকো’র সঙ্গে। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য সময় কাজ করেছেন জেন্ডার বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য।
শিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করতে করতেই মূলত শিশুদের জন্য বই লেখার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। তার এই স্বপ্নপূরণের যাত্রায় ইতিমধ্যেই সফল হয়েছেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ১১টি শিশুতোষ বই। এর মধ্যে দুটি বই তার নিজের লেখা বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ। তার লেখা গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন শিশুতোষ পত্রিকায়। শিশুদের জন্য সৃজনশীল লেখার স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেছেন ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ ও ২০১৯। ২০২০ সালে প্রথমা থেকে প্রকাশিত ‘ডিজিটাল দৈত্য ও রিমির আশ্চর্য পেনি্সল বক্স’ বইটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সবসময় প্রথাগত কিংবা প্রচলিতকেই প্রাধান্য না দিয়ে নিশাত সুলতানা কাজ করেন মনের আনন্দে এবং প্রজন্ম গঠনের দৃঢ়সংকল্পকে বুকে নিয়ে।
তিনি বলেন, ‘শিশুদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ আগামীর পৃথিবী নিশ্চিত করতে হলে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। শুধু শিশু নয় বৈষম্যের শিকার প্রতিটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে। মানুষের সাফল্য মূল্যায়নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে তাদেরকে আরো বেশী উত্সাহ দিতে হবে। এতে করে আরো অনেক ভালো সৃজনশীল কাজ পাওয়া সম্ভব সেই সফল ব্যক্তির মাধ্যমে।’
নিশাত স্বপ্ন দেখেন—নিজের ব্যক্তিগত আর কর্মজীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অদূর ভবিষ্যতে একটি সংগঠন দাঁড় করানোর; যে সংগঠন সামাজিক শান্তি আর সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করবে।