বুদ্ধি আর নেটওয়ার্ক সমানতালে চলিয়া থাকে। যেইখানে নেটওয়ার্ক নাই সেইখানে কিছুই নাই। মঙ্গল গ্রহে নাসার নতুন রোবট ‘পাসিভিআরান্স’-এর সঙ্গে যদি নাসার মূল কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তাহা হইলে এই অভিযানের সকল কিছু মুহূর্তেই শেষ হইয়া যাইবে। সুতরাং নেটওয়ার্কের যে অসীম গুরুত্ব, তাহা নূতন করিয়া বুঝিবার কিছু নাই। এমনকি সেই গুরুত্ব চোর-ডাকাত এবং জোচ্চোররাও খুব ভালো বোঝেন। তাহারাও নেটওয়ার্কের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন। সুতরাং আমরা বরং ভাবিয়া দেখিতে পারি—নেটওয়ার্ক কোথায় নাই? যেই ভিক্ষুকদের আমরা দীনদরিদ্র বলিয়া তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, তাহাদেরও একটা নেটওয়ার্ক আছে। অফিস-আদালতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়িয়া তোলা তো এই উপমহাদেশের খুবই সাধারণ চিত্র। আর টেন্ডারবাজিতে নেটওয়ার্ক থাকিবেই। না থাকাটাই বিস্ময়কর ব্যাপার।
পুরাতন পুথি হইতে জানা যায়, চোরেরা নেটওয়ার্কে সকলের চাইতে অধিক পারদর্শী। নেটওয়ার্ক তৈরি করিয়া চোরেরা বিড়ালের ন্যায় নিঃশব্দে গমন করিতে পারে। মৃগের ন্যায় দ্রুতবেগে দৌড়াইতে পারে। শ্যেনপক্ষীর ন্যায় সহসা গ্রাহ্যবস্তু ধরিতে ও খণ্ড খণ্ড করিতে পারে। কুক্কুরের ন্যায় নিদ্রিত ও জাগরিত ব্যক্তির বল পরীক্ষা করিতে পারে। সর্পের ন্যায় বক্ষঃস্থলেও গমন করিতে পারে। চুরিবিদ্যায় নেটওয়ার্ক কীভাবে গড়িয়া তোলা হইতেছে, সেই সংক্রান্ত একটি খবর গত মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত হইয়াছে। রাজধানী ঢাকায় বসিয়াই ইজিবাইক চুরি করিয়া থাকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন জেলাকে টার্গেট করিয়া থাকে চক্রটি। ইহার পর যাত্রীবেশে ইজিবাইকে উঠে তাহারা। অতঃপর নির্জন এলাকায় পৌঁছাইলে তাহারা ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রণ লইতে চাহে। চালক তখন বাধা প্রদান করিলে তাহাকে হত্যাও করিতে দ্বিধা করে না। চালককে হত্যা করিয়া তাহারা ইজিবাইক লইয়া চলিয়া যায়। ইহার পর ইজিবাইকটির নূতন দলিল বানাইয়া তাহা বিক্রয় করিয়া দেয় অপরাধী চক্রটি। এমনই একটি চক্রকে সম্প্রতি গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানা গিয়াছে, চক্রটি নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঢাকায় বসিয়া চুরির পরিকল্পনা করে। ইহার পর বিভিন্ন জেলায় তাহারা বাহির হইয়া যায়।
অপরাধের বিবিধ নেটওয়ার্কের চিত্র আমরা বিভিন্ন চলচ্চিত্রেও দেখিয়া থাকি। চলচ্চিত্র বহু ক্ষেত্রেই সমাজের ক্ষতকে উপস্থাপন করিয়া থাকে। উপমহাদেশের অনেক চলচ্চিত্রেই দেখা যায় অপরাধীরা জেলখানায় বসিয়াও অপরাধের নেটওয়ার্ক ঠিক রাখে। মাদক, চোরাচালান, খুন, দখল, চুরি-ডাকাতি, টেন্ডারবাজি—কত কিছুই না তাহারা কারা-কুঠুরিতে বসিয়াও নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে! ইহার কতটুকু সত্যি আর কতটুকু কল্পনা—তাহা কষ্টিপাথরে বিচার না করিয়াও বলা যায় নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে অনেক অসম্ভব কাজকেও সম্ভব করা যায়। ছুরি দিয়া যেমন মানুষ হত্যা করা যায় আবার উহা দিয়া শল্যচিকিত্সার মাধ্যমে মানুষের জীবনও বাঁচানো যায়। নেটওয়ার্কও তেমনই একটি ছুরি। ইহা দিয়া ভালো কাজের পাশাপাশি খারাপ কাজও করা যায়। তবে নেটওয়ার্ককে সকলেই সমীহ করেন। জ্ঞানীগুণীরা বলিয়া থাকেন, যাহার যত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, তাহার তত অধিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা থাকে। আমরা যদি বাংলা লোকসাহিত্যের ভান্ডারের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহা হইলে দেখিতে পাইব সেইখানে চোরের বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যের নানা গল্পে পরিপূর্ণ। উহাদের শক্তিও ঐ নেটওয়ার্ক। ১৮১২ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম কেরির ইতিহাসমালার একটি গল্পে রহিয়াছে চমকপ্রদ কাহিনি—চোর কীভাবে নিজের বুদ্ধিবলে রাজার শাস্তি হইতে রক্ষা পাইলেন এবং চোরের বুদ্ধি দেখিয়া রাজা এতটাই মুগ্ধ হইলেন যে, অবশেষে সেই চোরকেই তিনি রাজসভায় তত্ক্ষণাত্ মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ প্রদান করিলেন। ইহাতে অবশ্য রাজা খাল কাটিয়া কুমির আনিলেন কি না, তাহা অন্য প্রশ্ন।
তবে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, বুদ্ধি যস্য বলং তস্য। নেটওয়ার্ক তৈরিও ঐ বুদ্ধিরই অংশ। তবে বুদ্ধি যদি খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহার পরিণাম খারাপ হইবেই। কথায় আছে, চোরের দশ দিন গৃহস্থের এক দিন।