দুদকের অবৈধ সম্পদের মামলায় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিমের সাজা বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশেষ জজ আদালত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এই মামলায় তাকে ১৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। ঐ রায়ের বিরুদ্ধে হাজি সেলিমের আপিল পুনঃশুনানি করে ১০ বছরের সাজার আদেশ বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। আর দুদক আইনের আরেকটি ধারায় দেওয়া তিন বছরের সাজা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় দেয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে যাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হাজি সেলিমকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। যদি এই সময়ের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ না করেন তাহলে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নিতে আদালতকে বলা হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, আত্মসমর্পণ করে কারাগার থেকে রায়ের বিরুদ্ধে হাজি সেলিমকে আপিল বিভাগে আপিল করতে হবে। এরপর ঐ আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় তাকে সর্বোচ্চ আদালতে জামিন চাইতে হবে।
এদিকে এই সাজা বহাল থাকায় হাজি সেলিমের এমপি পদ বহাল থাকবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রায়ের পর দুদক কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, সংবিধানের ৬৬ (২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে নৈতিক স্খলনের দায়ে কেউ যদি দুই বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দুর্নীতির মামলায় হাজি সেলিমের ১০ বছরের সাজা বহাল থাকায় এটা তার নৈতিক স্খলন। তাই সাংবিধানিকভাবে তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তার সংসদ সদস্য পদ বাদ হয়ে যাবে। তবে বিষয়টি স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। হাজি সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উনার সংসদ সদস্য পদ ‘থাকবে’। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, দুর্নীতির এই মামলায় বিচারিক আদালতে দুদকের পক্ষে ২০ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সেসব সাক্ষ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। পর্যালোচনা করে আদালতের কাছে মনে হয়েছে যে দুদক তার মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে ২৭(১) ধারায় আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সেজন্য দুদক আইনের ২৭ (১) ধারায় ১০ বছরের সাজা প্রদান যথাযথ ও আইন সংগত হয়েছে। তবে ২৬(২) ধারায় আনীত অভিযোগ দুদক প্রমাণ করতে সক্ষম না হওয়ায় সেই ধারায় দেওয়া তিন বছরের সাজা বাতিল করা হলো। আদালত বলেছে, মামলার অভিযোগে আপিলকারীর বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য গোপনের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে এই ধারায় দেওয়া সাজা বাতিল করা হলো।
সেনাসমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের মামলা করে দুদক। ২০০৮ সালে বিশেষ জজ আদালত ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। ২০১১ সালে হাইকোর্ট তাকে খালাস দেয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। ২০১৫ সালে হাজি সেলিমের আপিল মামলার গুণাগুণের ভিত্তিতে পুনঃশুনানির জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। এরপরই আপিলের ওপর পুনঃশুনানি শেষে এই রায় ঘোষিত হলো।