মাধব রায়, কথাসাহিত্যিক
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
নীলকান্তবাবু বললেন-আচ্ছা তোমরা কি জানো ফ্যান ছাড়ার পর কেন কাগজগুলো দূরে আর কলমটা টেবিলের কাছে পড়ে থাকল?
রেখা বলল-কাগজটা তো পাতলা, এটি তো দূরে গিয়ে পড়বেই।
সীমা বলল-বাতাস তো হালকা জিনিসকে দূরে আর ভারি জিনিসকে কাছে নিয়ে ফেলবেই।
আকাশ এর মধ্যে একটা পদার্থবিজ্ঞানের গন্ধ পেলো। সে বলল-যদি বাতাস না থাকে আর আমরা একটা কাগজ আর একটা কলম এক সাথে ফেলি, তাহলে কী ঘটবে?
এখন সবাই নীলকান্তবাবুর দিকে তাকাল। বিন্দুও কান্না থামিয়ে শুনতে লাগল।
নীলকান্তবাবু বললেন, তাহলে শোন। এই পরীক্ষা প্রথম করেছিলেন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও। ১৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে ইটালির পিসা শহরে ১৮০ ফুট উঁচু হেলানো টাওয়ারের ছাদ থেকে তিনি বিভিন্ন ভরের বস্তু একসাথে ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন সবগুলো প্রায় একই সময়ে এসে মাটিতে পড়ে।
কণিকা বলল-কেন? ভারিটা আগে পড়বে না?
ভারিটা আগে পড়বে যদি কোনও বাধা থাকে। হালকা ও ভারি দুই বস্তুর ক্ষেত্রেই অভিকর্ষজ ত্বরণ সমান। কাজেই দুটোই একসাথে মাটিতে এসে পড়ার কথা।
অণু বলল-কিন্তু পিসার হেলানো টাওয়ার থেকে ফেললে তো বাতাস বাধা দেবে। তখন তো একসাথে পড়ার কথা নয়।
আর তাই পিসার পরীক্ষায় বস্তু দুটি প্রায় একইসাথে ভূমিতে পড়েছে, বললেন নীলকান্তবাবু। বাতাসের বাধা না থাকলে দুটো একসাথেই পড়ত। বাতাসের মধ্যে ভেসে থাকায় ওজনের বিপরীতে বাতাসের প্লবতা কাজ করে। ভারি বস্তুতে বেশি এবং হালকা বস্তুতে প্লবতা কম থাকায় দুটোর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী বল সমান হয় না।
অণু বলল-বাতাসের মধ্যে যদি একটা ভারি জিনিস, আর একটা হালকা জিনিস এক সাথে বেঁধে নিচে ফেলি, কী হবে?
নীলকান্তবাবু বললেন-তখন ভারি জিনিস তাড়াতাড়ি পড়তে চাইবে, হালকা জিনিস দেরিতে পড়তে চাইবে। ফলে হালকা জিনিস ভারি জিনিসকে টেনে আটকাতে চাইবে, কিন্তু পারবে না। যার ফলে উভয়ে একটু দেরিতে পড়বে।
বিন্দু এই সব শুনছে। ওর খাতা কলমের ভূমিপতনজনিত অপমানের জ্বালা বাবার আদরে অনেকটা প্রশমিত হয়েছে।
নীলকান্তবাবু বিন্দুর চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন-এই নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তিনটি সূত্র প্রদান করেন। এগুলোকে বলা হয় পড়ন্ত বস্তুর সূত্র। প্রথম সূত্রটি হলো-নিশ্চল অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে বাধাহীন অবস্থায় পড়তে থাকলে সকল বস্তু সমান দ্রুততায় নিচে নামতে থাকে। ফলে একই সময়ে সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।
দ্বিতীয় সূত্রটি হলো-বাধাহীন পথে পড়ন্ত বস্তু নির্দিষ্ট সময়ে যে বেগ প্রাপ্ত হয়, তা ওই সময়ের সমানুপাতিক।
আর একটু বুঝিয়ে বলো, বলল কণিকা।
বুঝলি না? প্রথম সেকেন্ড পর বেগ যদি 2 মি. পার সেকেন্ড হয়, দ্বিতীয় সেকেন্ড পর বেগ হবে 4 মি. পার সেকেন্ড, তৃতীয় সেকেন্ড পর হবে 6 মি. পার সেকেন্ড। এভাবে।
তাহলে তো ত্বরণও সমান হবে। বলল আকাশ।
হ্যাঁ, পড়ন্ত সকল বস্তুর ত্বরণই তো সমান।
মাথা ঝাঁকাল আকাশ, বুঝেছে।
তৃতীয় সূত্রটি হলো-বলছেন নীলকান্তবাবু, বাধাহীন পথে পড়ন্ত সকল বস্তুর নির্দিষ্ট সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব সময়ের বর্গের সমানুপাতিক।
মানে বুঝিয়ে দাও, বিন্দু এতক্ষণে কথা বলেছে।
পরের অংশ আগামীকাল